নারীশক্তি



গোটা একটা সপ্তাহ জেলে আটকে রেখে অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষা, জিজ্ঞাসাবাদ আর তদন্তের পর অবশেষে আজ কোর্টে তোলা হল দোষী রোশনি চৌধুরীকে । 

"শহরের এক বিশিষ্ট নেতার নাবালক ছেলে ও তার অতি ঘনিষ্ঠ এক বন্ধু, রোশনি হাতে হয়েছে শারীরিক অত্যাচারের শিকার। ঘটনাস্থলে নীরবে মুখে কুলুপ এঁটে বসে থাকা অবস্থায় পাওয়া যায় রশ্নি চৌধুরীকে । বর্তমানে দুজন ছেলেই ডক্টরের চিকিৎসাধীন, ওদের বয়ানে জানা যায় পুরো ঘটনা....  কী ভাবে রোশনি বিনা কারণে নৃশংস ভাবে ওদের আঘাত করে "....

এরকমই খবর শোনা গিয়েছিল গত রবিবার । নেতা মহাশয়ের উদ্যোগে সেদিনই গ্রেফতার হয় রশ্নি।  তারপর থেকে টানা আটদিন বিভিন্ন রকম জেরার পর আজ,সোমবার সকালে নিশ্চুপ রোশনিকে কোর্টে তোলার আদেশ দেন মহামান্য আদালত ।

টিভিতে এই খবর দেখে কেউ কেউ বলেছিলেন....
"ঠিক হয়েছে, বেশ হয়েছে, মেয়ে হয়ে ফায়দা লুটবে...ওসব দিন গেছে । দ্যাখ কেমন লাগে, বেশি চুলকানি তো । বেচারা ছোটো ছোটো ছেলেগুলোর কেরিয়ারটা শেষ করে দিল ।

আবার কেউ বলেছিলেন....
"ধুর ধুর, নেতার ছেলে, পার পাবে না তা আবার হয় নাকি ! কে কাকে অত্যাচার করেছে সেসব সত্যি চাপাই থেকে যাবে । ভিতরে ভিতরে উল্টো কেস হতেই পারে; নেতার তকমা নিয়ে ছেলেকে নাবালক সাজাতে কি আর বেশি সময় লাগে ! যাক গে, মোদ্দা কথা আজকাল হাজার হাজার ভীতু মেয়ে মরছে, তো আরো একটা মরলে কার বাবার কি যায় আসে?"

তো এইরূপ ভিন্ন ধারনার মানুষের সমালোচনার অবসান ঘটিয়ে আজ কোর্টে নিয়ে যাওয়া হয়েছে রোশনিকে ।

এই এক সপ্তাহে হাজার জেরার সম্মুখীন হয়েও একবারও মুখে রা কাটেনি রোশনি । কিন্তু আজ শুনানির উদ্দেশ্যে বেরিয়ে তার মুখে তৃপ্তির হাসি দেখা গেল । সে হাসি যেন বলছে, মেয়েটা এই মুহুর্তেরই অপেক্ষায় ছিল।

কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয় রোশনিকে । সামনের কাঠগড়ায় হুইল চেয়ারে অসুস্থ ছেলেদুটি । মাঝখানে নাবালকদের তরফের উকিল আর সর্বোচ্চ স্থানে বিচারক । দর্শকের স্থানে ছলছল চোখে রোশনির মা বাবা আর চকচকে চোখে নেতা ও তাঁর সাঙ্গপাঙ্গ ।

রোশনির তরফে কোনো উকিল নেই দেখে বিচারক যেই না জানতে চাইলেন যে রোশনির কিছু বলার আছে কি না, ওমনি রোশনি মুখ খুললো। আর সেই যে মুখ খুললো,থামল একেবারে শেষে ।

এক নিশ্বাসে বলা শুরু করল রোশনি......
--মাননীয় বিচারক মহাশয়, হ্যাঁ, আমি ওদের শারীরিক ভাবে অ্যাটাক করেছি । আমিই করেছি । কেন করব না বলুন তো? আমাকে রেপ করার টার্গেট নিয়েছিল... আমাকে ! বারবার 'আমাকের' তলায় আন্ডারলাইন করছি কেন, সেটা বুঝলেন না তাই তো, তাহলে আপনাকে একটু আমার কথা বলি আগে ।

আমি যখন বছর দশেক, আমার দাদু, মানে বাবার বাবা একদিন আমাকে জাপটে ধরে কোলে নিয়েছিলেন । বুকের মাঝে খামচে হাতড়ে কি যেন খুঁজছিলেন অনেকক্ষণ । খুব ব্যথা লেগেছিল সেদিন জানেন..... সেই রাতে ব্যথার কথা মাকে জানাতেই মা চোখের জল লুকিয়ে, শুধু বলেছিল-- " মেয়ে মানুষের সব কথা সবাইকে বলতে নেই মা, আজ থেকে কারোর কোলে উঠবি না...শুধু মা ছাড়া, ঘুমোবার সময় বালিশ বুকে আঁকড়ে ঘুমোবি; নিজের শরীরটাকে এই নোংরা সমাজের হাত থেকে বাঁচাবার যে আর কোনো উপায় নেই রে মা...."

সেদিন মার কথাগুলো শুনে শুধু বুঝেছিলাম নিজের শরীরটাকে বাঁচাতে হবে.....বাই হুক অর বাই ক্রুক ।
তারপর আবার যেদিন দাদু কোলে নিল, সেদিন ছুতো করে মগজাস্ত্র কাজে লাগিয়ে গরম চা ফেলে দিয়েছিলাম দাদুর গায়ে । মনে মনে এক অদ্ভুত ভালোলাগা তৈরি হয়েছিল সেদিন । যেন একপ্রকার জিতে গেছি ।
আর তারপর থেকে যত বড় হয়েছি, তত সাহস বেড়েছে ।

আমি তখন ক্লাস নাইন, ট্রেনের কাকুগুলো যখন পায়ে হাত বোলাতো অথবা পাশে বসে কনুই ছোঁয়াতে চেষ্টা করত আমার বুকের পাশে কিংবা কোমরের  খাঁজে, ঠিক তখনি আলগোছে ফুটিয়ে দিয়েছি মোক্ষম অস্ত্র - সেফটিপিন ।

তারপর যেবার জিওগ্রাফি কোচিংয়ে ঝুঁকে পড়ে নোট লেখার সময় চোখে পড়ল...স্যার তলচোখে জামার ভিতর দিয়ে আমার ভিতরটা তাড়িয়ে তাড়িয়ে উপলদ্ধি করছেন ঠিক তখনি ব্যবহার করলাম নতুন অস্ত্র - মুখের বুলি । মা দুর্গার  মত ভস্ম করে দেওয়া চোখে তাকিয়ে চিবিয়ে চিবিয়ে বললাম -- স্যার ব্রা পরতে আজ ভুলে গেছি, ওভাবে লুকিয়ে দেখবেন না প্লিজ, ইচ্ছে হলে বলবেন আমি নিজেই দেখাবো সেইসাথে আমার বন্ধুরাও একটু দেখে নেবে । 

আরো শুনুন, কলেজ থেকে বাড়ি ফেরার সময় যখন ভিড় বাসে পিছনে দাঁড়িয়ে কেউ গায়ে গা লাগিয়ে কোমরের নিচে শক্ত কিছুর ধাক্কা দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা চালাত, ব্রেক কষার সুযোগ বুঝে তখন আমি তার চেয়ে ঢের শক্ত আমার জুতোর হিলটা চাপিয়ে দিতাম তার পায়ের ওপর । কানে ভেসে আসত বাবা গো, মা গো গোঙানি । আহ! কি যে মজা লাগত, কি করে বলি ।

তারপর একদিন গেলাম একটা ইন্টারভিউ দিতে । সেখানে বসের চোখের দৃষ্টি দেখেই গন্ধ আমার ভালো ঠেকেনি । শেষে যখন বললেন ওঁর ফ্ল্যাটে মাঝে মাঝে যেতে হবে আমায়, শুনেই চাকরি রিজেক্ট করে উঠে পড়েছি বেরোনোর উদ্দেশ্যে, ওমনি পথ আটকে ধরল ওই পিশাচটা । ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে সে আর আমি পিছিয়ে যাই । শেষে দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ায় যখন আর কোনো উপায় নেই.......ঠিক তখনি আমার অনবদ্য অস্ত্র কোদালের মত দাঁত আর ড্রাকুলার মত নখ দিয়ে মালটাকে আঁচড়ে খামচে শেষে কাঁধের ব্যাগে পর্যাপ্ত পরিমাণে সঞ্চয় করা লঙ্কার গুঁড়ো বের করে ওঁর চোখে এক মুঠো ডলে দিয়ে পালিয়ে বাঁচি ।

তো এই হল আমার গল্প জজসাহেব । বুঝলেন, এরকম একটা মেয়ের পিছনে সেদিন ওরা লেগেছিল। কী করে ছেড়ে দিই বলুন তো? সেই অফিস থেকে পিছু নিয়েছিল, শেষে রাতের অন্ধকারে ফাঁকা রাস্তায় বাগে পেয়ে আমাকে টেনে নিয়ে গেল একটা গ্যারেজ মত জায়গায় । ভয় যে করছিল না তা নয় তবে ভয়কে চেহারায় ফুটে উঠতে দিইনি । পিঠের ঘাম থাই বেয়ে নামছিল । হাতগুলো ঘেমে উঠেছিল । ভয়ে গলা শুকিয়ে আসছিল । আমাকে অর্ধনগ্ন করার পর ওদের নোংরা উক্তি শুনে মার কথা খুব মনে পড়ছিল.... শেষে মাথাটা বাঁই করে ঘুরে গেল । গরম রক্তের পারদ চড়ে গেল মাথার ঘিলু পর্যন্ত........ নিমেষে খুলে ফেললাম আমার চূড়ান্ত ধারালো অস্ত্র 'খোঁপার কাঁটাখানা' আর নৃশংস ভাবে চালিয়ে দিলাম ওদের একজনের এক চোখে আর একজনের ঘাড়ে । তারপর সাধন করলাম আমার চিরকাঙ্ক্ষিত কাজটা.... খবরে এত এত নিরীহ মেয়ের ধর্ষিতা হয়ে মারা যাওয়ার ঘটনাগুলো আমাকে বড়ো টানত।
মন চাইত ওদের হয়ে নীরব মিছিল নয়, অস্ত্র তুলে আন্দোলন করি । 

সেদিন পেয়ে গেলাম সেই সুবর্ণ সুযোগ ।ওরা যখন ব্যথায় কাতরাচ্ছে, ঠিক তখনই এগিয়ে গিয়ে কাঁটা গেঁথে গেঁথে ক্ষতবিক্ষত করে দিলাম ওদের যৌনাঙ্গ ।
আহ কি শান্তি ।
তবে পালিয়ে আমি যাইনি । গ্যাট হয়ে ওদের পাশে পড়ে থেকেছি । তখনও জানতাম না ওদের একজন নেতাবাবুর ছেলে......বিশ্বাস করুন জানলে গলাটাও চিরে দিতাম । অমন কুলাঙ্গার ছেলে নেতার বাড়িতে থাকলে যে দেশেরও বদনাম । কিন্তু পরে জানলাম উনি বিচার চান, সুবিচার... ওনার নাবালক ছেলেদের জন্য; সেদিন নেতা সম্বন্ধে ধারনা আমার স্পষ্ট হয়ে গেল ।
আচ্ছা বলতে পারেন.....যারা আঠেরো প্লাসের ক্লাব, পাবগুলোতে অনায়াসে ঢুকে যায় তারা কী করে নাবালক হয়?  যারা নির্দ্বিধায় পর্নোগ্রাফি দেখে তারা কী করে নাবালক ! যারা একটা মেয়েকে ছিঁড়ে খায় পশুর মতো, তারা কোন অংশে নাবালক ! যারা নোংরা অশ্রাব্য গালি দেয় মা তুল্য নারী জাতিকে তারা সত্যিই কি নাবালক??

খানিক থেমে রোশনি আবার গর্জাল.......
--জানেন আমি এই গোটা সপ্তাহ কেন চুপ করে ছিলাম ? কারণ আমি জানতাম, আমি যদি বলি যে ওরা আমাকে রেপ করতে চেষ্টা করেছিল আর নিজেকে বাঁচাতে আমি ওরকমই স্টেপ নিয়েছি, তাহলে ওই পুলিশের পোশাক পড়া নেতার পোষা ঘুষখোর কুকুরগুলো প্রতিবারের মতো এবারেও পয়সার লোভে দাবিয়ে দেবে নারীকণ্ঠ । চোখ দিয়ে গিলে নেবে আমার শরীরটা । এগিয়ে এসে জিভ চেটে প্রশ্ন করবে কোথায় কোথায় ছুঁয়েছিল ওরা, কী ভাবে, কোন হাত দিয়ে ছুঁয়েছিল, কী কী নোংরা কথা বলেছিল, আর সর্বশেষ প্রশ্ন.....আমি রাত নটার সময় ওখানে কী করছিলাম, কারোর ফ্ল্যাটে ছিলাম কিনা, ছোটো টপ পড়েছিলাম কিনা......ইত্যাদি । আসল ধর্ষণ তো আমার তখনই হত।
সে ক্ষেত্রে আদালতে আসার আগেই হয়তো আমার বিচার হয়ে যেত.... আমাকে কিছু টাকা দিয়ে বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হত । কিন্তু আমি তো তা চাইনি, আমি চেয়েছি আমার মত হাজার নারীদের হাতে অস্ত্র তুলে দিতে.... অসুরমর্দিনি মা দুর্গার অস্ত্র, আমি চেয়েছি আন্দোলন, আমি চেয়েছি প্রত্যেক নারীকে নারীশক্তি সম্পর্কে অবগত করতে.............

আমি চুপ করে ছিলাম বলেই না ওদের একতরফা বয়ানে আমার শাস্তির জন্য কেসটা এইভাবে সেজেগুজে আদালতে উঠে এলো...আসল ঝড়টা উঠল । ওরা ভেবেছিল এইভাবে আমার  নীরবতার সুযোগ নিয়ে প্রত্যেক নারীকে নোংরা প্রমাণ করে দেবে, ভেবেছিল প্রমাণ করবে, মেয়েরাই নিরীহ ছেলেদের অত্যাচারের শিকার বানায় বারবার আর সমাজ সেগুলোকে ধর্ষণের নাম দেয় । দেখুন তো কেমন নিজের জালে নিজেরাই ফেঁসে গেছে । ওরা বুঝতেই পারেনি নীরবতা মানে মেনে নেওয়া নয়.... কখনো কখনো নীরবতা মানে আগাম ঝড়ের স্তব্ধতা ।

অপরপক্ষকে কোনো সুযোগ না দিয়ে আবার বলে উঠলো রোশনি.....
--আমাকে প্লিজ শাস্তি দিন । আমি সমাজের অন্তত একজন ধর্ষককে শাস্তি দিতে পেরে আজ সম্পূর্না । তাই আজ কোনো ভয় নেই । আমি আপনার বিচার মাথা পেতে নেব ।

কথাগুলো বলে বিচারকের চোখে চোখ রাখল রশ্নি । সারা বিচারকক্ষ এখন নীরবতায় মোড়া। সবাই তাকিয়ে আছে বিচারকের দিকে । রোশনির গা দিয়ে যেন ঠিকরে বেরোচ্ছে অসুরবধের রোশনি।

ওদিকে মুখ চুন করে দাঁড়িয়ে পুলিশ থেকে শুরু করে ওই পক্ষের উকিল, এবং সাথে নেতা ও তার সো কলড্ নাবালক ছেলেরা।

নীরবতা ভেঙ্গে পেন তুলে খসখস করে রায় লিখলেন বিচারক ।
ভরা আদালতে রোশনি চৌধুরীকে আজ নির্দোষ প্রমাণ করা হল । 
হবে নাই বা কেন, দিনের শেষে বিচারকও যে একজন নারী, তাই রোশনির চোখের সত্যতা তার চোখ এড়ায়নি । সত্যের জয় যে অনিবার্য ।

এই ঘটনার পর বেশ কিছু নারীদের হাত ধরে রোশনি শুরু করে সেল্ফ ডিফেন্স ট্রেনিং ক্লাস....যেখানে ট্রেনার কিন্তু রশ্নি নিজেই ।
নারীদের হাতে অস্ত্র তুলে দিতে হবে ওকে....... যাতে এবার থেকে শুধু ধর্ষক নয়, নারীকে কুদৃষ্টিতে দেখা প্রতিটা মানুষ শাস্তি পায় ।

রাকেশ ঘোষাল

Comments

Popular posts from this blog

গ্রীষ্মের_ছুটিতে ছাত্রের লেখা খোলা চিঠি