পিছুটান



অন্য কাউকে বিয়ে করার খুব তাড়া ছিল তাই না! শুনেছি, তোর স্বামী খুব বড়লোক, টাকাপয়সা গাড়িবাড়ি সবকিছুই আছে, তাই হয়তো আমাকে ছাড়ার কাজটা তোর পক্ষে খুব সোজা ছিল তাই না মোহর?

-----আজো কথা শোনাবে মাধব দা? সারাজীবন কথাই শুনিয়ে গেলে, কোনোদিনও কিছু শুনতে চাইলে না, এটাই তোমার দোষ জানো তো!....যাকগে এখন শরীর কেমন আছে?

------আমার শরীরের খবর নিতে এত দূর ছুটে এলি মোহর? চলে যাওয়ার সময় তো দিব্যি বলেছিলি আমাকে নাকি তোর ঘেন্না করে।

-----হ্যাঁ বলেছিলাম, তখন সম্পর্ক ছিল, অভিমান ছিল, ফিরে আসার ইচ্ছে ছিল, ফিরিয়ে নেওয়ার অপেক্ষা ছিল তাই বলেছিলাম, এখন আর কিছুই বাকি নেই। কি জানো তো মাধব দা, তোমায় আমি এখনো ঘেন্নাই করি, ঘেন্না করি বলেই তোমায় মনে রেখেছি। 

তোমায় গোটা জীবন ঘেন্না করে যাবো, শুধু তোমার শরীর খারাপের খবর পেলে বুকটা কেমন কেঁপে ওঠে। মনে হয় আমার একটা বিশেষ মূল্যবান জিনিস হারিয়ে যাচ্ছে ধীরে ধীরে, আমার কেমন পাগল পাগল অবস্থা হয়। তুমি চলে গেলে কাকে ঘেন্না করবো মাধব দা?

কার উপর রাগ করে মাঝরাতে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদবো! কার উপর রাগ করে ভাতের থালা ছুঁড়ে ফেলে দেবো! কার উপর রাগ করে বঁটিতে মাছ কাটতে গিয়ে হাত কেটে ফেলবো?

সব সম্পর্ক ভালোবাসার হয় না মাধব দা, কিছু সম্পর্ক ঘেন্নারও হয়, তোমার আমারটাও তেমনই, বলো কেমন আছো? আমায় আবার বাড়ি ফিরতে হবে।

-----তুই কেমন আছিস মোহর? তোর স্বামী তোর খুব যত্ন করে তাই না? আমার মতো কথায় কথায় রেগে যায় না তোর উপর তাই না বল? রাস্তা ঘাটে কোনোদিন তোকে অপমানও করেনি আমার মতো, খুব ভালো স্বামী পেয়েছিস শুনেছি....

------হ্যাঁ এটা খুব সত্যি বলেছো তুমি! ও ভীষণ ভালো মানুষ, আমরা কোনোদিনও একে অপরকে "ভালোবাসি" বলিনি। কিন্তু আমি বাইরে গেলে ও বারবার ফোন করে জিগ্যেস করে কখন ফিরবো, কিভাবে ফিরবো! ও যখন অফিসে থাকে, তখন মেসেজ করে খেয়ে নিতে বলে সময়ে....

একসঙ্গে সবজি কিনতে গেলে বাজারের ভারি ব্যাগটা আমার হাত থেকে ও কেড়ে নেয়, যেদিন জামাকাপড় অনেকগুলো ভিজিয়ে ফেলি, ও আমাকে না জানিয়ে বাথরুমে ঢুকে সব কেঁচে রাখে। ছাদেও মেলে আসে, দুপুর বেলা আমি খেয়ে একটু বেশি ঘুমিয়ে পড়লে বিকেল বেলা আমার জন্য গরম চা এনে মুখের সামনে ধরে, কোনো কোনো সময় রাতের খাবারটাও ও রান্না করে.....

প্রতি মাসে পিরিয়ডের দিন গুলোতে আমায় একটা কাজও করতে দেয় না, বাইরে থেকে খাবার আনে, তলপেট ভীষণ ব্যথা করলে ওষুধ খাইয়ে আমায় ঘুম পাড়িয়ে দেয় বুকের মধ্যে জাপটে নিয়ে....

-----থাক না মোহর, ইচ্ছে করছে না এসব শুনতে, তুই এবার আয়, তোর বাড়ি ফিরতে লেট হলে তোর বর চিন্তা করবে।

-----ওমা থাকবে কেন! তুমি তো শুনতে চাইলে মাধব দা! ও তোমার চেয়ে অনেক অনেক বেশি আমার খেয়াল রাখে, কাঁদলে আমার চোখ ফুলে যায়, ও ঠিক বুঝতে পারে সব কিন্তু কোনোদিন প্রশ্ন করেনি কার জন্য আমার দু চোখ বেয়ে অভিমান ঝরে.....

ওর কাছে আমি চির কৃতজ্ঞ, ও আমাকে সামলে রেখেছে, কিন্তু আমি ওকে ভালোবাসতে পারিনি জানিনা কেন! কিন্তু পারিনি....

হ্যাঁ তবে এটাও জানি আমি ওকে কোনোদিন ছাড়বো না, ওর সাথে থেকে যাবো, কারণ ওর চেয়ে বেশি করে আমায় আর কেউ আগলে রাখতে পারবে না....

তুমি এত খারাপ কেন মাধব দা? কেন তুমি আমায় এত সহজে যেতে দিলে? কেন রেখে দিলে না নিজের কাছে?

------আমি খারাপ না হলে তুই আমায় মনে রাখতিস মোহর? দেখ না, ভালো মানুষদের তো সবাই মনে রাখে, খারাপ মানুষদের জন্য চিন্তা করে কজন এত দূর থেকে ছুটে আসে বল তো? খারাপ মানুষদের জন্য কজন মাঝরাতে কাঁদে বল তো?

-----আমি ওকে কেন ভালোবাসতে পারছি না মাধব দা? ও তো তোমার চেয়ে ভালো, সবদিক থেকে ভালো তবুও কেন পারছি না?

-----মোহর তুলনা করে ভালোবাসা যায় কখনো? ভালোর কি কোনো শেষ আছে মোহর? ভালোবাসা কি মেপে মেপে হয়?  তোর আমার ভেতর যে আবেগ ছিল, সেটা তো তুই সম্পূর্ণ খরচ করে ফেলেছিস আমার জন্য, তোর ভেতর আর কোনো আবেগ নেই, তাই তোর বরকে জড়িয়ে ধরলেও আমার গায়ের গন্ধ খুঁজিস, তোর বরকে তুই কোনোদিনই অনুভব করিসনি, ওর ভেতরেও তুই আমায় খুঁজেছিস....

-----আমি আসি মাধব দা, দেরি হচ্ছে।

----শোন না, অনেক অপমান করেছি তোকে, ক্ষমা চাইবো না, তুই ক্ষমা করে দিলে আমি কি নিয়ে বাঁচবো? তোর ঘেন্না টুকুই আমায় বেঁচে থাকার রসদ জোগায়, শুধু একটা আবদার রাখবি?

-----কী বলো।

-----আমায় একবার জড়িয়ে ধরবি মোহর? অনেকদিন তোকে স্পর্শ করিনি।

-----না, মাধব দা, তোমায় জড়িয়ে ধরলে তোমায় ফেলে আর যেতে পারবো না, আমায় যেতে দাও, পিছুটান বড় অসহায় করে দেয় মানুষকে মাধব দা, আর কোনো পিছুটানে জড়াতে চাই না, নিজেকে আমি অনেক কষ্টে গুটিয়ে নিয়েছি, এবার আসি, ভালো থেকো....

রাকেশ ঘোষাল

Comments

Popular posts from this blog

গ্রীষ্মের_ছুটিতে ছাত্রের লেখা খোলা চিঠি