শ্রীময়ী
-- বৌদি তাড়াতাড়ি এসো, লাস্ট ব্যাচ বসবে এবার ।
-- আমি আর এতো বেলায় খাবোনা রাতুল , তোমার দাদাকে বরং বসিয়ে দাও ।
-- দাদাকে বসাচ্ছি , কিন্তু তুমিও এসো ।
-- বাকিরা সবাই খাওয়া দাওয়া করেছে তো ভালো ভাবে? আমি তো দেখতেই পেলাম না ওদিকটা ।
-- সবাই খেয়েছে , তুমি চলে এসো । আমি গেলাম...
-- আচ্ছা ।
খুড়তুতো ননদ আভেরি এসে পাশে বসলো হঠাৎ...
-- খেতে যাবেনা কেন বৌদি?
-- ইচ্ছা করছেনা রে...
-- বড্ডো ক্লান্ত দেখাচ্ছে তোমাকে আজ । একটু শরবত করে এনে দিই ? খাও !
হাসলো সামান্য কুহু । সকাল থেকে গলা ভেজানোর সময় সত্যিই পায়নি আজ সে , পুজোর কাজ গোছানো, অতিথি সৎকার সবকিছু করতে করতে ভুলেই গিয়েছিলো প্রায় নিজের কথা । বললো...
-- আচ্ছা , যা তাহলে... নিয়ে আয় !
খুশি মনে উঠে গেলো আভেরি । বিছানার ওপর ছড়িয়ে রয়েছে অসংখ্য প্যাকেট । এক পাশে সরিয়ে রাখতে থাকলো সেগুলো । কি হবে এসব? কেন দেয় লোকে এসব? কিসের নিয়ম জানেনা কুহু... বোঝেনা ।
জানলার গরাদে মাথা টা ঠেকিয়ে দাঁড়ায় । দূরে তাকালে সারি সারি বাড়ির মাথা দেখা যায় শুধু । আর দেখা যায় এক চিলতে আকাশ । এই এতগুলো বছরে পাল্টালোনা কিছুই... দিল্লি থেকে যখন এসেছিলো এই বাড়িতে , এতটুকু ভালো লাগেনি কুহুর । নিজের প্রফেসর বাবার ওপর দারুন অভিমান হয়েছিল সেদিন । উত্তর কলকাতার এই গলির মধ্যে এই মুখার্জি বাড়িতে আজ তেরো বছর আগে বিয়ে হয়ে এসেছিলো কুহু । বাবার প্রিয়তম ছাত্রের সাথে চার হাত এক হয়েছিল তার, বাবার ইচ্ছেতেই । ছোট থেকে মাকে ছাড়া বেড়ে ওঠা কুহুর মাকে নিয়ে স্মৃতি ছিলোনা কোনো । বাবার শিক্ষাতেই শিক্ষিত ছিল সে , তাই বিয়ের পর অরিনের সাথে প্রথম এই বাড়িতে যখন আসে ভালো না লাগলেও মেনে নিয়েছিল । অরিনের মা শ্রীময়ী দেবী বরণডালা সাজিয়ে ঘরে তুলেছিলেন তাকে । সাংসারিক জ্ঞানের অভাবে উপচে পড়া ঘট পা দিয়ে উল্টিয়ে, দুধে আলতায় পা ডুবিয়ে ডান পা বাড়িয়ে ছাপ রাখার অপরাধে অরিনের বাড়ির লোকজন যখন ক্ষুব্ধ, বলাবলি করছে...
-- তখনি বলেছিলাম রাঙা বৌদিকে দিল্লির মেয়ের সাথে ছেলের বিয়ে দিয়োনা । কলকাতায় কি মেয়ে ছিলোনা? দেখলে কেমন ডান পা আগে বাড়িয়ে সংসারের অকল্যাণ ডেকে আনলো বিয়ের প্রথম দিনেই !
-- এই মেয়ে কদ্দিন সংসার করে দেখো শুধু ! রূপের কি অহংকার... !
অসহায় চোখে চারিদিকে তাকিয়ে ছিল কুহু । শ্রীময়ী তার হাতখানি ধরে নিয়েছিলেন , সকলের দিকে তাকিয়ে দৃঢ় কণ্ঠে বলেছিলেন...
-- বাচ্চা মেয়ে, ভুল করতেই পারে । আয় মা, আয় দেখি... আসতে আসতে পা ফেলে এগিয়ে আয় ।
অরিন ছিল বছর দুয়েকের বড় কুহুর চেয়ে । ঘরে এসে বলেছিলো...
-- মা তো প্রথম দিনেই তোমাকে আমার বোন বানিয়ে দিলো, এবার কি হবে?
শুধু হেসেছিলো কুহু , মুখে কিছু বলেনি ।
বিশাল তিনতলা বাড়িটার আনাচে কানাচে ঘুরিয়ে সব চিনিয়েছিলেন শ্রীময়ী নিজের পুত্রবধূকে । তারপর নিয়ে এসেছিলেন নিজের ঘরে । কৌতূহলী দৃষ্টি ভিড় জমাচ্ছিলো দরজার বাইরে । তাদেরকে বিদায় করেছিলেন নিজেই । পুরোনো সেগুন কাঠের উঁচু বিছানায় বসিয়েছিলেন কুহুকে, আয়না বসানো কাঠের আলমারি খুলে একখানা বড়সরো কাঠের বাক্স বের করে এনে রেখেছিলেন কুহুর সামনে । অবাক হয়ে কুহু দেখছিল কালচে ব্রাম্হি কাঠের কারুকাজ করা বাক্সটা ! শ্রীময়ী ডালাটা খুলে একে একে কুহুকে পরিয়ে দিয়েছিলেন বাক্সের গয়নাগুলো । সাজানো শেষ হলে অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে থাকতে থাকতে বলেছিলেন...
--আমার যোগ্য উত্তরাধিকারীর হাতে তুলে দিলাম আমার সর্বস্ব , সুখী হও ।
বিয়েবাড়ির কাজ, নিয়ম সব মিটলে ধীরে ধীরে বিদায় নিয়েছিল আত্মীয় স্বজন । এই বাড়িতে তখন অনেক লোকজন । যৌথপরিবারগুলোয় যেমনটা হয়... কুহু, অরিন, শ্রীময়ী, কুহুর শশুর বিভাস আর অরিনের কাকা, কাকিমা আর খুড়তুতো ভাই রাতুল এবং খুড়তুতো বোন আভেরি । কুহুর ঘর টা ছিল দক্ষিণ মুখি, দোতলার শেষের ঘরটা... যেটা ছিল রাস্তার ধারে । গোটা বাড়িতে বারান্দা ছিলোনা কোনো , তবে বড় বড় মেঝে পর্যন্ত নামানো জানলা ছিল প্রতিটা ঘরে কাঠের খড়খড়ি লাগানো । আভেরি, রাতুল সহজেই মিশে গিয়েছিলো কুহুর সাথে... বন্ধুত্ব তৈরি হতে সময় লাগেনি বেশি । শ্রীময়ী ছিলেন একটু রাশভারী গোছের । বাড়ির কারোর ওঁর মুখের ওপর কথা বলার সাহস ছিলোনা বড় একটা ।
একদিন দুপুরে নিজের ঘরে একা বসে ছিল কুহু ।গল্পের বই পড়ছিলো কোনো... ঘরে এলেন শ্রীময়ী । হাতে একটা বেশ বড় বাটি , ঢুকেই দরজাটা ভেজিয়ে দিলেন ।
-- কি করছিস?
-- এই তো, বইটা পড়ছিলাম... এসো ।
-- এই দেখ কি এনেছি !
বলে হাতের বাটিটা দেখালেন । কাঁচা লঙ্কা দিয়ে জাড়ানো কতবেল মাখা । দুটো আঙুলের মাথায় অল্প একটু তুলে মুখে দিতেই টক টক ভাবে মুখটা হাস্যকর ভাবে বিকৃত হয়ে গিয়েছিলো কুহুর । শ্রীময়ী হেসে উঠেছিলেন হো হো... তারপর অর্ধেকের বেশি কুহু একাই খেয়ে ফেলেছিলো কতবেল মাখা ।
এরপর থেকে মাঝে মধ্যেই নিশ্চুপ দুপুরগুলো কেটে যেত অসমবয়সী দুই নারীর গল্পগাথায় । সাথে থাকতো কতবেল মাখা, ঘটি গরম, আলুকাবলি অথবা ঘুগনি ।বাইরে বাকি সবাই রাশভারী শ্রীময়ী কে চিনলেও কুহুর চোখে ধরা পড়ে গিয়েছিলেন শ্রীময়ী সেদিনই আর প্রারম্ভ হয়েছিল ওদের বড়ই নিবিড় এক বন্ধুত্ব... ।
ধীরে ধীরে কুহু জানতে পারে শ্রীময়ীর ছেলেবেলার কথা , বাবা মায়ের কথা ইত্যাদি আরো অনেক অজানা কথা । জানতে পারে ওঁর বাড়ি ছিল চন্দননগরে । বাংলা সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনা করেছিলেন শ্রীময়ী , তারপর বিয়ে হয়ে কলকাতায় আসা , টুকটাক কবিতা লিখতেন আগে । বিয়ের পর সংসারের জোয়াল টানতে টানতে একসময় সুন্দর করে মলাট দিয়ে বাঁধানো সৌখিন কবিতার খাতার ওপর জমেছিলো পুরু ধুলোর আস্তরণ । শশুর শাশুড়ি দেওর স্বামী সবাইকে সামলে ওঠার আগেই অরিন এসেছিলো ওঁর কোল জুড়ে । তারপর দেওরের বিয়ে হলো , সংসার বড় হলো, ধীরে ধীরে বিদায় নিলেন শশুর শাশুড়ি... কর্ত্রী হলেন শ্রীময়ী , দায়িত্ব বাড়লো আরো অনেকখানি ।
কুহু বলেছিলো...
-- তুমি কবিতা লিখতে যে খাতায় তা কি আছে না হারিয়ে গেছে?
-- আছে... রেখে দিয়েছি আলমারিতে ।
-- আমি দেখবো , দেখাবে ?
-- দেখাবো , তবে এবাড়িতে কেউ কিন্তু জানেনা যে আমি কবিতা লিখতাম !
-- আচ্ছা ।
_________________
-- বৌদি, এই নাও শরবত টুকু খেয়ে নাও ।
আভেরির ডাকে সমে ফিরলো কুহু । অতীতের স্মৃতিতে হারিয়ে গিয়েছিলো কিছুক্ষনের জন্যে ।
-- তোর দাদারা খেয়েছে?
-- সবাই খেয়েছে তুমি ছাড়া ।
-- মনটা একটু খারাপ লাগছে রে , একটু একা থাকি?
-- বেশ , কিছু দরকার হলে বোলো । দরজাটা টেনে দিয়ে চলে যায় আভেরি ।
খাটের বাজুতে হেলান দিয়ে বসে কুহুর মনে পড়লো আবার...
কয়েকদিন পরে শ্রীময়ী এনে দেখিয়েছিলেন তাঁর কবিতার খাতাখান । খাতার ওপর বড় বড় করে লেখা শ্রীময়ী চ্যাটার্জী । একটা একটা করে কবিতাগুলো পড়েছিল কুহু... যত পড়েছিল ততই অবাক হয়েছিল ওঁর ভাষাশৈলীর মাধুর্যে ! বলেছিলো...
-- অপূর্ব লিখতে তুমি মা , আর কেন লেখোনা?
শুধু হেসেছিলেন শ্রীময়ী...
দেখতে দেখতে বছর দুয়েক কেটে গিয়েছিলো । সেবার ছিল আভেরির বিয়ে । প্রিয় ননদের বিয়ের যাবতীয় দায়িত্ব কুহু তুলে নিয়েছিল নিজের কাঁধে । বিয়ের বাজার, শাড়ী, গয়না প্রতিটা জিনিস নিখুঁত পছন্দের কিনেছিলো । কুহু যখন সকলের প্রশংসা কুড়োচ্ছিলো ঠিক সেই সময়েই কাকি শাশুড়ি এসে পড়লেন ঘরে । গম্ভীর মুখে বলেছিলেন...
-- কুহুর সাথে আমার কিছু কথা আছে... সবাই একটু বাইরে যাও ।
শ্রীময়ী কিছু না বলে বসে রইলেন যেমন ছিলেন । কুহু একটু তঠস্থ হয়ে উঠেছিল যেন !
-- তুমি আছো , একদিকে ভালোই হলো দিদি ! কথাটা আমি তোমার সামনেই বলতে চাই ।
একটু থেমে বললেন...
-- আসলে আমি চাইনা আভেরির বিয়ের কাজ কুহু করুক । যদিও কুহুকে আমি খুব ই ভালো....
হাত দেখিয়ে থামিয়েছিলেন শ্রীময়ী নিজের ছোট জাকে । বলেছিলেন...
-- দুরকম কথা বলিসনা ছোট । তুই তোর এক মেয়ের বিয়ের কাজে আরেক মেয়েকে না থাকতে বলছিস !এটা কি সত্যি হয় কখনও ! সত্যিটা হলো তুই চাস কুহু তোর মেয়ের বিয়েতে না থাক , কোথাও যেন ওর ছোঁয়া না থাকে , কিরে তাই তো?
-- না দিদি ঠিক তা নয় । আসলে লোকে নানান কথা... জানোই তো সব !
-- লোকের ওপর চাপাসনা ছোট , বল না এটা তোর মনেরই কথা ! দুই বছরের ওপর বিয়ে হয়ে গেলো... এখনো কোনো খবর হলোনা ! তাই কুহু হঠাৎ সবার থেকে আলাদা হয়ে গেলো... না রে?
চুপ করে গিয়েছিলেন কাকিশাশুড়ি । কুহুর দৃষ্টি আটকে ছিল মাটিতে । লুকিয়ে রাখা কষ্টগুলো একটু একটু করে তখন জমছে তার চোখের কোনে ।বলেছিলো...
-- আমি থাকবো না আভেরির বিয়েতে কাকিমা , আমি দিল্লি চলে যাবো, বাবার কাছে ।
-- কোথাও যাবিনা তুই । বলেছিলেন শ্রীময়ী ।
-- কুহু ভুল বুঝিসনা আমাকে তুই ! কাকিশাশুড়ী বলে উঠেছিলেন ।
শ্রীময়ী উত্তর দিয়েছিলেন -- সমস্ত বিয়ের বাজার যখন কুহু আর আভেরি মিলে করলো তখন কিছু বলিসনি কেন , ছোট ? আভেরির বিয়ের শাড়ী, তত্বের শাড়ী, গয়না.. সবেতেই তো লেগে আছে কুহুর ছোঁয়া ! এখন তবে যা , গিয়ে সব আবার নতুন করে কিনে নিয়ে আয় ! পারলে মনটাকে একটু বড় করতে শেখ ছোট , বয়সে বড় হলেই সম্মান পাওয়া যায়না সম্মান পাওয়ার জন্যে যোগ্যও হতে হয় তাকে !
সেদিন কাকিশাশুড়ি চলে যেতেই শ্রীময়ীর কোলে মাথা রেখে কান্নায় ভেঙে পড়েছিল কুহু । সন্তান স্নেহে শান্ত করেছিলেন কন্যাসমা পুত্রবধূকে ।
আভেরির বিয়ের সমস্ত কাজ নিজে দাঁড়িয়ে থেকে করিয়েছিলেন কুহু কে দিয়ে । শ্রীময়ীর ওপর কথা বলার সাহস হয়নি আর কারো । শ্রদ্ধায় ভালোবাসায় মুগ্ধ কুহু শ্রীময়ীকে সেদিনই বোধহয় নিজের না দেখা মায়ের স্থান অর্পণ করে ফেলেছিলো !
◆◆◆
একটা দীর্ঘশ্বাস ছিটকে এলো কুহুর মনের গভীর থেকে আজ । কেটে গিয়েছে দীর্ঘ এগারোটা বছর... কুহুর ঘর , কুহুর কোল আজও শূন্য । বহুবার বলেছিলো অরিন সন্তান দত্তক নেওয়ার জন্যে , রাজি হয়নি কুহুই । শ্রীময়ী বলেছিলেন -- যা করলে তুই ভালো থাকবি , তাই করবি । কারো কথায় কিছু করবিনা কখনো । এতে লোকে দুর্বল ভাবে ।
-- অরিন চায় দত্তক নিতে , কিন্তু আমি চাইনা !
-- অরিনের জায়গায় ও ঠিক তোর জায়গায় তুই !
-- দত্তক নিলে যদি ভালো বাসতে না পারি... তখন?
-- ঠিকই তো , এটা সহজ কাজ নয় একেবারেই , সবাই পারেনা ।
শেষ কথাগুলো বলার সময় শ্রীময়ীর দিকেই চেয়ে ছিল কুহু । ঠিক বোঝেনি সেদিন কথাগুলোর অর্থ... আজ হয়তো বা কিছুটা বুঝছে !
সেবার অরিন কনফারেন্সে গিয়েছিলো কানাডায় । কুহুর ভারী ইচ্ছা সে বইমেলায় যাবে , মন খারাপ করে একলা বসেছিল ঘরে । শ্রীময়ী এসে বলেছিলেন -- রেডি হয়ে নে, বেরোবো আমরা ।
নাক টানতে টানতে কুহু প্রশ্ন করেছিল...
-- কোথায়?
-- বইমেলায় ।
খুশিতে আত্মহারা হয়ে উঠেছিল কুহু , তৈরি হয়ে বেরিয়ে পড়েছিল দুজনে । জোর করে কিনে দিয়েছিলো শ্রীময়ীকে জয় গোস্বামীর কবিতার বই । বলেছিলো -- এগুলো পড়বে তুমি ,এগুলো তোমার ।
উজ্জ্বল চোখ মেলে তাকিয়েছিলেন শ্রীময়ী কুহুর দিকে । প্রচুর ঘুরে, বই কিনে, খাওয়া দাওয়া করে বাড়ি ফিরেছিল দুজনে ।
সেবার কুহুর জন্মদিন । পরপর কয়েক বছর বাবাকে ছাড়াই জন্মদিন কাটিয়েছে কুহু , সেবারটা ভারী মন খারাপ ছিল তার । ঘুম ভেঙে উঠে স্নান সেরে একে একে সকলকে প্রণাম করেছিল ও । শ্রীময়ীর দেওয়া লাল ঢাকাই জামদানিতে অপরূপা হয়ে উঠেছিল যেন আরো ! শ্রীময়ীকে প্রণাম করার সময় শ্রীময়ী বলেছিলেন -- আরো একখানা চমক আছে তোর জন্যে ।
দুপুর তখন একটা বাজে । শ্রীময়ী নিজে রান্না করেছেন সেদিন । কুহুর পছন্দের সব রান্না , খেতে বসেছে সকলে । বাইরের দরজায় শব্দ শুনে সবাই একটু বিব্রত । শ্রীময়ী নিজে উঠে গেলেন , যখন ফিরলেন সাথে কুহুর বাবা । একটাও কথা বলতে পারেনি কুহু সেদিন , ভালোবাসা মাখা কৃতজ্ঞতায় গলা বুজে এসেছিলো শুধু । অপলক চেয়েছিল শ্রীময়ীর দিকে ।
◆◆◆
চোখ দুটো ভিজে উঠেছে আজও । শারীর আঁচলে মুছে নিচ্ছে চোখদুটো বারবার ! দরজায় কেউ ধাক্কা দিচ্ছে...
-- কে ? ভেতরে এসো !
দরজাটা খুলে গেলো । অরিন আর রাতুল ভিতরে ঢুকলো ।
-- সারাদিন কিছুই খেলে না?
-- খেয়েছি , শরবত খেয়েছি । আভেরি নিয়ে এলো ।
-- সবাই খুঁজছিলো তোমাকে বৌদি , আমি বললাম তোমার মনটা ভালো নেই , তাই আর নামোনি নীচে ।
-- আমি ওখানেই তো ছিলাম ! কাজ মেটার পরেই তো ওপরে এলাম !
-- মায়ের ছবিটা কোথায় রাখা হবে কুহু? অরিন প্রশ্ন করলো ।
-- ভাবছিলাম যদি আমাদের ঘরেই রাখি ?
একটু চুপ থাকলো অরিন , তারপর রাতুলের দিকে একবার তাকিয়ে উত্তর দিলো -- রাখো , আমি তাহলে বলে দিচ্ছি ওদের । কোনখানটায় রাখবে বলে দিও তুমি !
-- আচ্ছা ।
◆◆◆
এই তো সেদিন স্মার্ট ফোনটা কিনে এনে দিয়েছিলো কুহু । বাচ্চা মেয়ের মতো কত উৎসাহ নিয়ে শিখলেন, বুঝলেন সব । মাঝে মাঝে বলতেন -- আয় , বস দেখি আমার কাছে ! মা মেয়ে একসাথে কটা ছবি তুলি !
আজ যে ছবিটায় সকালে নিজে হাতে চন্দন পরাচ্ছিলো কুহু , সেই ছবিটা কদিন আগে কুহুই তো তুলে দিয়েছিলো । কি অপূর্ব দেখাচ্ছিল সেদিন শ্রীময়ীকে ! বিবাহবার্ষিকী ছিল সেদিন ওঁদের দুজনের । চওড়া লাল পাড় অফ হোয়াইট জমির বেনারসি আর ভারী গয়নার সাজ, সিঁদুরে রাঙা সীমন্তিনীতে সেজে যখন ঘরের বাইরে বেরিয়ে এসেছিলেন গর্বে মনটা ভরে উঠেছিল কুহুর... মনে হয়েছিল তার মা এতো সুন্দর ! শ্রীময়ীকে বলেছিলো...
-- মা এক মিনিট । একটু দাঁড়াও ।
নিজের ঘর থেকে নিয়ে এসেছিলো একটা বড় উজ্জ্বল লাল টিপ , পরিয়ে দিতে দিতে বলেছিলো -- এইবার কমপ্লিট... এইবার সবাই দেখবে আমার মাকে ।
কুহুর কপালে এঁকে দিয়েছিলেন শ্রীময়ী স্নেহ চুম্বন ।কুহুর হাতের রান্না খেয়ে সেদিন সকলে যখন সাধুবাদ জানাচ্ছিল , টেবিলের এক কোনায় দাঁড়িয়ে মিটিমিটি হাসছিলেন শ্রীময়ী । আর দুটো চোখে ঝিলিক দিয়ে উঠছিলো খুশি... আর গর্ব... একইসাথে !
রান্নাবান্না কিছুই পারতো না কুহু , হাতে ধরে সবটা শিখিয়েছিলেন শ্রীময়ী । ইচ্ছা আর ভালোবাসার জোরে শিখে নিয়েছিল কুহুও ।
দরজায় আওয়াজ হলো । মনে হয় ছবিটা এনেছে... !উঠে গিয়ে খুলে দিলো দরজাটা , দুটো লোক ধরাধরি করে নিয়ে এসেছে শ্রীময়ীর বড় করে বাঁধানো ছবিটা । জিজ্ঞেস করছে...
-- কোথায় রাখবো বৌদি? ফপ
গলার কাছটায় কি যেন একটা দলা পাকিয়ে যাচ্ছে ! ঢোক গিললো কয়েকবার । লোকগুলো দাঁড়িয়ে আছে... একটা লোক আবার বললো...
-- দাদা বললো এই ঘরেই আনতে !
-- হ্যাঁ ,এই ঘরেই থাকবে । একটা কাজ করো , ওই যে দুটো জানলার মাঝের ফাঁকা জায়গাটা দেখছ ,ওখানটাতেই রাখতে হবে... ছবিটা ।
লোকদুটো কাজ করছে । দেওয়ালে ড্রিল করছে... ধুলো ছড়িয়ে যাচ্ছে চারপাশে । বিছানার ওপর শ্রীময়ীর ছবি , কত দুপুর ঠিক ওই খানটাতেই বসে গল্প করেছেন শ্রীময়ী ! কত অগুনতি নির্জন দুপুরের সঙ্গী ছিলেন কুহুর ! সবকিছু যেন আরো নতুন করে ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে ! শূন্যতার অতল গহবরে ক্রমশ হারিয়ে যেতে যেতে দরজার গায়ে হেলান দিয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে কুহু । লোকগুলোর কাজ হয়ে গেছে...
-- দেখে নিন বৌদি , ঠিক আছে তো? দাদা নিচে ব্যস্ত , তাই আপনাকেই দেখতে বললো ।
-- ঠিক আছে ভাই , এসো ।
ঘর খালি হতেই অপলক চেয়ে রইলো কুহু ছবির শ্রীময়ীর দিকে...
◆◆◆
সেদিন ঠাকুর ঘরে পুজো করছিলেন শ্রীময়ী । অনেক সময় নিয়ে যত্ন ভরে পুজো করতেন রোজ । কুহু তখন কাজ করছিল রান্নাঘরে , সকালের জলখাবার তৈরি করছিলো । অরিন, রাতুল তৈরি হচ্ছিলো নিজের নিজের কাজে যাওয়ার জন্যে । কাকিশাশুড়ির শরীর ভালো ছিলোনা , তিনি নিজের ঘরে শুয়ে ছিলেন । কুহুর শশুর এবং কাকাশ্বশুর যার যার নিজের কাজে ব্যস্ত ছিলেন ।
সব কাজ সেরে ঘন্টা দুয়েক পর রান্নাঘর থেকে বেরিয়েও কুহু দেখতে পায়না কোথাও শ্রীময়ীকে ! জিজ্ঞেস করে জানতে পারে তাঁকে অনেক্ষনই দেখেনি কেউই ! একটা অজানা আশংকা অজান্তেই আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে ফেলছে তখন কুহুকে ! সিঁড়ি ভেঙে উঠে গিয়েছিলো সে ঠাকুর ঘরে... ঠাকুরঘরের দরজার সামনে দাঁড়াতেই ছিটকে সরে এসেছিলো কুহু... দেখেছিলো রাধামাধবের বিগ্রহর সামনে লুটিয়ে পড়ে রয়েছেন শ্রীময়ী ! কপালে হাত ছোঁয়াতেই বুঝেছিলো সব শেষ । শক্ত থাকার চেষ্টা করেছিল সেদিনও কুহু । সকলকে ডেকে আনা থেকে শুরু করে লাল বেনারসিতে শ্রীময়ীকে সাজিয়ে পায়ে আলতা, সিঁথিতে সিঁদুর, কপালে বড় লাল টিপ... সবটা করেছিল নিজেই । চুপ করে এক কোনায় দাঁড়িয়ে শেষ বিদায়টুকু জানিয়েছিল শ্রীময়ীকে । কাঁচের গাড়িটা যখন চোখের আড়ালে অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিলো... স্থবিরের মতো তখনো দাঁড়িয়েই ছিল কুহু । আভেরি ঘরে নিয়ে এসেছিলো ওকে ।
পরদিন ঠাকুর ঘরে একাই একবার উঠে গিয়েছিল ও । বসে ছিল একা রাধা মাধবের সামনে । কিছু বলার ছিলোনা, জানারও ছিল না... চুপ করে বসে ছিল কেবল । রাধামাধবের পায়ের পাশে রাখা বইয়ের মতো কিছু একটা দেখতে পেয়ে হাত বাড়িয়ে টেনে আনলো সেটাকে...
শ্রীময়ীর কবিতার খাতা ! এখানে !
পাতা ওল্টাতে থাকলো কুহু । চোখ আটকে গেছে একটা পাতায়... এই কবিতাটা আগে লেখা ছিল না তো ! পড়তে আরম্ভ করলো...
প্রাণসখা ,
সূর্য ডোবার কালবেলায় সঙ্গী হলি আমার,
কি বা আছে দেওয়াই মতো... কিই বা দেবো তোকে?
তবু বুঝলি না তুই...
তাই বাঁধলি আমায় ডোরে !
তুচ্ছ এই মানব জীবন
আরো তুচ্ছ আমি ,
সংসারের অগ্নিদাহে দগ্ধ হয়েছি আমি !
প্রতিনিয়ত তাই হয়েছে আমার কবিতাদেরও দহন ।
কন্যা নাকি প্রাণসখা নাকি পুত্রবধূ !
জানিনা আমি সত্যি কে তুই...
শুধু জানি...
দুহাত দিয়ে ঢেকে রাখিস তোরই বাহুডোরে !
-- ইতি তোর মা
শ্রীময়ী মুখার্জি
কবিতার খাতাটা বুকে চেপে ধরে ধীর পায়ে নিচে নেমে এসেছিলো কুহু । যত্ন করে তুলে রেখেছিলো আলমারিতে । এই কদিনে বার করেনি একবারও ।আজ উঠে গিয়ে আলমারির ভিতর থেকে কবিতার খাতাটা বের করলো । রেখে দিলো নিজের বালিশের পাশে ।
সন্ধেবেলায় অরিন ঘরে ফিরেছে , কুহুর পাশে এসে বসলো ।
-- কিছু একটু খাও এবার ! সকাল থেকে খাওয়াদাওয়া নেই ।
-- আমার কিছু কথা আছে অরিন !
-- হ্যা বলো ।
কবিতার খাতাটা এগিয়ে দিলো অরিনের দিকে কুহু । একটু অবাক হয়ে অরিন জিজ্ঞেস করলো...
-- কি এটা?
-- মায়ের কবিতার খাতা ।
-- মায়ের কবিতার খাতা মানে ? মা কবে কবিতা লিখলো ?
স্পষ্ট অবিশ্বাসের ছোঁয়া বেজে ওঠে অরিনের গলায় । চুপ করে যায় কুহু , অরিন বলে...
-- মা কবিতা লিখতো ? সত্যি ?
উত্তর দেয়না কুহু । আর কিছু না বলে একটা একটা করে পাতা ওল্টাতে থাকে অরিন । পড়তে থাকে অখ্যাত এক কবির কবিতা । কুহু চেয়ে দেখে পড়তে পড়তে আজ চোখগুলো ভিজছে অরিনের ও...
-- অরিন ! আমি মায়ের কবিতাগুলো প্রকাশ্যে আনতে চাই । তুমি সাহায্য করবে ?
কুহুর হাত টা চেপে ধরে অরিন । আজ অরিনের চোখে কৃতজ্ঞতার আবেশ ধরা পড়ে কুহুর চোখে । চোখটা হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে মুছতে মুছতে বলে...
-- করবো কুহু , অবশ্যই করবো ।
একটু সময় চুপ করে থাকে দুজনেই । কিছুক্ষন পর অরিনের দিকে সরে এসে ওর কাঁধে মাথা রাখে কুহু ।দুজনের দৃষ্টিই শ্রীময়ীর চন্দনসজ্জিত ছবিটার ওপর আবদ্ধ । কুহু বলে...
-- এবার চলো ওই অনাথ আশ্রমটায় , যেখানে নিয়ে যাবে বলেছিলে আমাকে অবাক হয়ে তাকায় অরিন নিজের তেরো বছরের বিবাহিতা স্ত্রীএর দিকে । কপালে একটা উষ্ণ চুম্বন এঁকে দিয়ে বলে...
-- নিয়ে যাবো খুব শিগ্রী ।
একটু পরে অরিন হঠাৎই বলে ওঠে...
-- আজ একটা গান গাইবে কুহু? কতদিন গান শুনিনা তোমার গলায় ! গাইবে ?
উঠে গিয়ে জানলার পাশটায় দাঁড়ায় কুহু । গানটা ঠিক শুরু করতে যাবে... সেই সময় দূরে নয় কাছেই কোথাও বেজে উঠছে অন্য একটা গান । কিন্তু কুহুর বড় প্রিয় সে গান , ভারী মনের কাছের... সে চুপ করে যায়... শুনতে থাকে......
জানলা দিয়ে ভেসে আসে সুর আর গানের অদ্ভুত মিশেল... অরিন কুহুর পাশে এসে দাঁড়ায় । সুন্দর , অন্যরকম এক বাতাবরণ সৃষ্টি করে বেজে ওঠে.......
চিরসখা হে , ছেড়ো না মোরে ছেড়ো না।সংসারগহনে নির্ভয়নির্ভর, নির্জনসজনে সঙ্গে রহো ॥
অধনের হও ধন, অনাথের নাথ হও হে, অবলের বল।
জরাভারাতুরে নবীন করো ওহো সুধাসাগর ॥
চোখটা বন্ধ করে মাথাটা এলিয়ে দেয় কুহু অরিনের কাঁধের ওপর । তারপর মাথাটা ঠেকায় জানলার গরাদের গায়ে ।তার চোখ থেকে গাল, গাল হতে চিবুক হয়ে ঝরে পড়তে থাকে আজ শ্রাবনের বারিধারা.... !
রাকেশ ঘোষাল
Comments
Post a Comment