টুসু



গতকাল বিকেলবেলা একটা ফুচকার গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছি। ফুচকা গাড়ি তখনও পুরোপুরি খোলেনি। ফুচকা গাড়ির মালিক জল দিয়ে রাস্তার চারপাশের ধুলো ধুয়ে দিচ্ছিলো। তার স্ত্রী ছুরি দিয়ে ধনেপাতা কুচিয়ে দিচ্ছে। আমি হ্যাংলার মত আগাম দাঁড়িয়ে আছি দেখেই দুজনে তাড়াতাড়ি হাত চালাতে লাগলো।
ঠিক সেইসময় একটা বছর ঊনিশের মেয়ে এসে দাঁড়ালো সাইকেল নিয়ে। পিঠে ব্যাগ, পরণে টমেটো লাল চুড়িদার, ওপরে সোয়েটার, মুখখানা বড্ড আদুরে আদুরে। হাসিখানা ঠিক ফুচকার টক জলের মতই দুষ্টুমিতে মাখিয়ে সে বললো, মা তাড়াতাড়ি করো, আমি দুটো খেয়ে তবে যাবো। 
তার মা রাগ করে বললো, তুই না এই সাড়ে তিনটের সময় ভাত খেলি? এখন  চারটের সময় ফুচকা খেলেই রাতে পেটে যন্ত্রণা হবে। ভাগ এখান থেকে, দেব না। 
মেয়েটা বাবার দিকে তাকিয়ে বললো, দোকানের প্রথম কাস্টমারকে ফিরিয়ে দিতে নেই। বাবা বললো, ফ্রির কাস্টমারকে সব সময় ফিরিয়ে দিতে হয়। মেয়েটা গজ গজ করতে করতে বললো, এমন বাবা-মা কেউ জীবনে দেখেনি। দুটো খাই?
মা একটু থেমে বললো,শুকনো খা তাহলে। জল দিয়ে নয়। বাবা বললো, জল ছাড়া কি ফুচকা জমে? তাই না রে টুসু? তোর মা-টা কিছু বোঝে না। 
টুসু একমুখ হেসে বললো, সেটাই তো বোঝাতে পারি না। মা বললো, তোকে আর বোঝাতে হবে না। সাবধানে সাইকেল চালিয়ে যাবি। খিদে পেলে কেক কিনে খেয়ে নিবি। মেয়েটা মায়ের দিকে তাকিয়ে মুখটা বেঁকিয়ে নিয়ে চলে গেলো। 
ফুচকা কাকু বললো, দুটো দিতে পারতে তো। 
মহিলা বললো, তুমি জানো না তাই বলছো। দুপুরে একবাটি চাটনি খেয়েছে। অম্বল হলে রাতে খাবে না বলবে তখন। এমনিতেই তো পেটে লাগে ওর উল্টোপাল্টা খেলে। 
ফুচকাকাকু বললো, ওর বাবার সঙ্গে আজ সকালে বাজারে দেখা হলো। একবারও টুসুর কথা জিজ্ঞেস করলো না। রাজা কাজ কেমন করছে জানতে চাইলো। মা বললো, বাপটাই তো আসল গো। নাহলে এমন করে! কতবার বুঝিয়েছিলাম মেয়েটার পরীক্ষা হয়ে যাক তারপরে বিয়ে দেবেন। 
আমি কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, এটা আপনাদের মেয়ে নয়? ফুচকা কাকু বললো, হ্যাঁ আমাদের মেয়ে, মানে বৌমা। 
আমি বললাম, ও কিসে পড়ে?
মহিলা বললো, মেয়েটার মাথা খুব ভালো। আমার ছেলের মত ফেলুরাম নয়। আমার ছেলেটা তো মাধ্যমিকের পরে পড়লো না। গয়নার দোকানে কাজ করে। মেয়েটা মাধ্যমিকে খুব ভালো রেজাল্ট করেছে। আমার ছেলের সঙ্গে প্রেম করেছিল। আমরা জানতে পেরে বলেছিলাম, দুজনেরই একটু বয়েস হোক, বিয়ে দেব। আমার ছেলেরও বয়েস একুশ বছর। মেয়ের বাবা কিছুতেই শুনলো না। আঠেরো হলো আর বিয়ে দিয়ে দিল। এমনকি উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষাটা অবধি দিতে দেয়নি। আমরা এখন পড়াচ্ছি। এক বছর নষ্ট হলো। এ বছর ও উচ্চমাধ্যমিক দেবে। এরপর কলেজেও পড়বে। আমি বলে দিয়েছি, এখনই যদি বাচ্চা কাচ্চা আনিস তো দূর করে দেব। পড়ায় খুব মন মেয়ের। বাড়ির কাজ করতে দিই না বেশি। ভালো করে পরীক্ষাটা দিক। ভালো রেজাল্ট করলে ওর বাবাটার মুখে গিয়ে ছুঁড়ে দিয়ে আসবো। 
আমার ফুচকা প্যাক হয়ে গিয়েছিল। ফুচকাকাকু একটু সংকোচে বললো, একটা কথা জিজ্ঞেস করবো? 
আমি বললাম, করুন। 
বি.এ পাশের পরে কি পড়াশোনা করলে চাকরি পাবে মেয়েটা? 
আমি বললাম, চিন্তা করবেন না। বিএ পড়ার পর ও নিজেই বুঝে যাবে ওকে কি করতেI  হবে। আপনাদের মত মানুষ যার পাশে আছে তার আবার চিন্তা কি!
টুসুর শাশুড়িমা বললো, তবুও আমরা তো শিক্ষিত নই, তাই ঠিক জানি না, কি পড়লে ভালো হবে। তাই সবাইকে জিজ্ঞেস করি, কোন মাস্টারের কাছে পড়লে ও ভালো রেজাল্ট করবে এসব তো এত বুঝি না। 
আমি বললাম, ভাগ্যিস আপনারা শিক্ষিত নন। ভাগ্যিস বোঝেন না যে বাড়ির বউ চাকরি করলে আর বশে থাকবে না, তাই টুসু বাঁচছে এমন স্বাধীন ভাবে....এত আদরে... 
মহিলা হেসে বললো, মেয়েটা আমার পাগলী। শুধু লেখাপড়াতেই ভালো। 
ভালো থাকুক টুসুরা। ভালো থাকুক এমন শাশুড়ি নামের মায়েরা। জন্মদাতা আর গর্ভধারিণী এভাবেই কন্যাদায় সেরে ফেলুক অল্পবয়সে বিয়ে দিয়ে। 

রাকেশ ঘোষাল

Comments

Popular posts from this blog

গ্রীষ্মের_ছুটিতে ছাত্রের লেখা খোলা চিঠি