সেই হাটে


আমিও একদিন সকাল সকাল সেই হাটে গিয়ে হাজির হলাম। এলাকা ভিড়ে গমগম করছে। ক্রেতাদের অধিকাংশ মহিলা হলেও পুরুষদের উপস্থিতি নেহাত কম নয়। এদিক ওদিক ঘুরছি। দেখি এক জায়গায় স্বামী কেনা বেচা নিয়ে দরদাম চলছে। কানে এলো,


--- "দিদি এই স্বামীটা কিন্তু ভালো। বয়স পঁয়তাল্লিশ হলেও একদম ফ্রেশ। সব কাজে জানে। সস্তায় পাচ্ছেন কিন্তু..."


--- "না, না.! বড্ড দাম বলছেন, আমার বাজেট আরও কম, একটু সস্তার দেখান।"


--- "তাহলে ওকে দেখুন। ওই যে, শেষের দিক থেকে দুজন ছেড়ে যে বসে আছে ওকে নেবেন.? খুব ভালো বাজার করে। তাছাড়া বউয়ের খুব বাধ্য।"


আমি আর একটু এগিয়ে গেলাম। দেখি এক জায়গায় জটলা.! এক মহিলা একজন পুরুষের হাত ধরে তারস্বরে চিৎকার করছেন,


--- "কী ভেবেছেন কী.? ভালো বলে বাজে মাল গছিয়ে দেওয়া.? অ্যাঁ.! ব্যাটা কোনও কাজই করে না। সারাদিন টিভি দেখে আর তাস খেলে। বেচার সময় তো বলেছিলেন, হেব্বি স্বামী.! সব কাজ করবে..."


--- "আরে দিদি আমি তো যা শুনেছি তাই বলেছি। এত রেগে যাচ্ছেন কেন.? ভুল তো হতেই পারে। আচ্ছা, বদলে দিচ্ছি। এই দেখুন.! এই স্বামীর পেডিগ্রি কিন্তু দারুন। এর ঠাকুরদা ঘর জামাই ছিল, এর বাবাও ঘর জামাই ছিল। আর তাছাড়া আপনাকে ১০% ডিস্কাউন্ট দেব..."


--- "দেখে দেবেন.! এবার যদি কোনও গন্ডগোল হয় তাহলে ক্রেতা সুরক্ষা দপ্তরে কেস করব আপনার নামে..."


--- "আরে না না.! আর হবে না। আর বাই চান্স কিছু হলে বলবেন, পুরো পয়সা ফেরত।"


যাক ডিল হয়ে গেল। আমিও গুটিগুটি পায়ে আরও এগিয়ে গেলাম। দেখলাম এক ভদ্রলোক দোকানদারকে বলছেন, 


--- "দেখুন দাদা.! আমার একমাত্র মেয়ে। তার জন্য একটা সুন্দর, ভদ্র, সভ্য, স্বামী লাগবে।"


--- "পেয়ে যাবেন মেসোমশাই.! কিন্তু দাম একটু চড়া পড়বে।"


--- "কত ভাই.?"


--- "নর্মালের থেকে ৩০% বেশি।"


--- "অ্যাঁ..."


--- "আরে মেসোমশাই, মাল্টিতে চাকরি করে, বাড়ি আছে, গাড়ি আছে। সবচেয়ে বড় ব্যাপার এক ছেলে, ননদের কোন লাফড়া নেই। বাপ মাও একসাথে থাকে না। এই মাল কমে হয় বলুন তো.!"


--- "দেখো না বাবা.! একটু যদি কমসম করা যায়..."


--- "হবে না মেসোমশাই.! অলরেডি তিনজন লাইনে আছেন। নিতে হলে ৫০% এডভান্স করে বুক করতে হবে।"


আরেকটু এগিয়ে পাশের দোকানে কান পাতলাম। শুনলাম কথা হচ্ছে 


--- "দিদি এটাকে নিয়ে যান। গায়ে গতরে জোর আছে, বাড়ির সব কাজ করতে পারবে। উপরি হিসাবে মাথায় টাক আর বাঁধানো দাঁত.! তাই তেল আর পেস্টের একপয়সা খরচা লাগবে না। আপনার সাশ্রয় হবে।"


--- "বাহ.! বেশ ভালো তো.! দাঁত খুলে রাখলে শক্ত জিনিস খেতেও পারবে না। আচ্ছা দাম কত.?"


আমি ক্রমশ ঘেমে উঠছি। আরও একটু এগিয়ে গেলাম। দেখি একজন বয়স্ক আধুনিকা মহিলা দোকানদারকে বলছেন,


--- "দেখো ভাই.! আমার বয়স্ক হলেও চলবে। বাড়িতে কাজের লোক আছে। তেমন খাটা খাটনির কাজ কিছুই নেই। একটাই কাজ, আমার পেছন পেছন ঘুরতে হবে,  মার্কেটিং এর সময় বিরক্ত হলে চলবে না। এমন কেউ আছে তো বলো.!"


--- "আছে মাসিমা। ওই যে দেখছেন, সাদা কোঁকড়ানো চুলের স্বামী.! এই গতবছর অবসর গ্রহণ করেছেন। খুব শান্ত স্বভাবের.! আপনি চাইলে একবার সামনে এনে দেখতে পারেন।"


আরও এগিয়ে গেলাম। দেখি একজন তার পুরনো স্বামীকে বেচতে এসেছেন। দোকানদার বলছে 


--- "না ম্যডাম.! সেকেণ্ড হ্যান্ডে এত দাম দেওয়া যাবে না। তার ওপরে বলছেন সুগার আছে। যে নেবে তার তো খরচা আছে না.!"


--- "তো কী.? আজকাল তো সুগার সবার আছে। এমন করে বললে হয় ভাই.!"


--- "সেতো বুঝলাম। কিন্তু যাকে আবার বেচব সে কি নেবে.? সবাই ফেরেশ মাল চায়। তা আপনি কি শুধু বেচবেন না কিনবেনও.?"


--- "সে রকম ভালো পেলে একটা কিনতেও পারি।"


--- "একজন আছে। বয়স বেশি না কিন্তু মাতাল।"


--- "না বাবা.! মাতাল ফাতাল নেব না।"


--- "আরে শুনুন না.! মাতাল হলেও কুড়ি লাখ টাকার পলিসি আছে। ব্যাপারটা বুঝুন..."


--- "আমাকে কি বাকি প্রিমিয়াম দিতে হবে নাকি.?"


--- "না না.! ওয়ান টাইম পলিসি ছিল। সঙ্গে নিয়ে যান, মাল খেয়ে লিভারের যা অবস্থা তাতে বড়জোর হলে আর বছর দেড়েক।"


--- "হুমম..."


আমি আর নিতে পারছি না। এদিক ওদিক তাকিয়ে হাট থেকে বেরিয়ে যাচ্ছি। হঠাৎ এক মহিলা আমার হাত ধরে চেঁচাতে শুরু করলো,


--- "এই দেখ কার মাল, চুপি চুপি পালিয়ে যাচ্ছে।" আমি যত বলি,


--- "আরে আমি হাট দেখতে এসেছি।" কিন্তু কে কার কথা শোনে। আমার কথা শুনে চারদিক থেকে আওয়াজ উঠল,


--- "দেখি দেখি মালটাকে, মাথায় টাক আছে নাকি.?"


--- "না রে বড় একটা ভুঁড়ি আছে।" বলেই আঙুল দিয়ে ভুঁড়িতে একটা খোঁচা মারলো। আমি চিৎকার করে উঠলাম। মনে হল হাতে কিছুর ছ্যাঁকা লাগলো।


--- "কি গো আটটা বাজে, বাজার করতে যাবে না...!!!"


রাকেশ ঘোষাল

Comments

Popular posts from this blog

গ্রীষ্মের_ছুটিতে ছাত্রের লেখা খোলা চিঠি