অশেষবাবুর কম্পিউটার ক্লাস


শ্লথ পায়েই গোটা রাস্তাটা হেঁটে হেঁটে এলেন উনি। কিন্তু ঠিক ইউক্যালিপটাস গাছদুটো দেখা পর থেকেই হাঁটার গতিটা বেড়ে গেলো। সেই ছাব্বিশে যখন স্কুলে ঢুকেছিলেন তখন থেকেই এই গাছদুটো দেখলেই কেমন একটা অদ্ভুত মায়ার বশবর্তী হয়ে যান উনি। শরীরের লোহিত রক্তকণিকারা দ্রুতগামী হয়। নিজের স্কুল লাইফ মনে পড়ে যায়।  বিবেকস্যার, জগবন্ধুস্যারের স্নেহ মিশ্রিত বকুনি আর ছাত্র তৈরির প্রচেষ্টা মনে পড়লে একটাই কথা মনে হয় - আমি মানুষ গড়ার কারিগর। বিজনবিহারী বিদ্যালয়ের গেটের দুদিকে প্রায় মাথায় সমান দুটো ইউক্যালিপটাস গাছ আছে। এরা যেন কম্পিটিশন করে লম্বা হয়েছে। কেউ কাউকে এক ইঞ্চি মাটি ছাড়তে রাজি নয়। এই সুস্থ প্রতিযোগিতা বড় পছন্দের অশেষবাবুর। বেশ বুঝতে পারেন ভাঙন ধরছে বিজনবিহারীর রন্ধ্রে রন্ধ্রে। ছাত্র থেকে শিক্ষক সকলের মূলে পচন ধরেছে। ক্ষতবিক্ষত হন উনি, যখন ঢুকেছিলেন তখন যারা শিক্ষক ছিলেন সকলেই প্রায় রিটায়ার করেছেন। উনি আর শান্তিময়বাবুই আরও বছর পাঁচেক ব্যাট করে অল আউট হবেন। নতুনরা জায়গা দখল করছে বলে ওনার আপত্তি নেই, আপত্তিটা অন্য জায়গায়! 


স্কুলে ঢুকেই অশেষ মজুমদার দেখলেন কয়েকজনের মধ্যে কেমন একটা ঢিলেঢালা ভাব। এই হয়েছে কিছু শিক্ষক- শিক্ষিকাদের দোষ। শনিবার মানে ক্লাসের তোড়জোড় নেই। রবিবার তো ছুটি, শনিবারও হাফ ছুটি, তাতেও চারটে ক্লাস যেন নিয়ে উঠতে ইচ্ছে করে না এদের। অশেষবাবু টিচার্স রুমে ঢুকে একটু বিরক্ত মুখেই নাম প্রেজেন্টের খাতাটা নিয়ে গজগজ করতে করতে বললেন, এই জন্যই ছাত্রছাত্রীরা আজকাল শিক্ষকদের সম্মান করে না। আগে নিজেদের আচরণে গুরু ব্যাপারটা প্রকট হতে হয় তবেই সম্মান পাওয়া যায়। প্রসেনজিৎ মোবাইলে ক্যান্ডিক্রাশ খেলছিল, এটা তার ভীষণ নেশার জিনিস। এখুনি ফিজিক্যাল সাইন্সের ক্লাস আছে ক্লাস এইটের, তবুও খেলাটা থামাতে পারছে না। পাশেই শ্রাবন্তী গোটা দুই শান্তিপুরের শাড়ি গছানোর ধান্দায় আছে নীলিমা সেনকে। নীলিমাদি সংস্কৃতর শিক্ষিকা, শাড়ির প্রতি একটা দুর্বলতা আছে বছর চল্লিশের মহিলার। শ্রাবন্তীর শ্বশুরবাড়ি শান্তিপুরের কাছেই। এমনিতে শ্বশুরবাড়ি সে যায় না বললেই চলে। নেহাত শাড়ির বিজনেসটা কন্টিনিউ করছে বলেই মাঝে মাঝে শ্বশুরবাড়িতে ওর পদধূলি পড়ে। অনেকেই বলে, সরকারি চাকরি করলে নাকি সাইড বিজনেস করা বেআইনি! নিকুচি মেরেছে ওসব আইনের, শ্রাবন্তীর সামনে এসে কেউ একবার বলুক দেখি, ছেড়ে দেবে ভেবেছে? নীলিমাদি এখনও কনফিউশনে রয়েছে পোড়ামাটি রঙের তাঁতটা নেবে, নাকি হালকা পিঙ্ক। 

অশেষবাবু ঢুকতেই সবাই একটু নড়েচড়ে বসলো। মুকুলস্যার বলেন, অশেষবাবু নাকি সকলের বিবেকের কাজ করেন। শুনে সকলেই হেসেছিল একদিন। ভদ্রলোকের বড় ইচ্ছে কাদার তালকে নিজের হাতে মূর্তি গড়বেন। এত বছরে অনেক কাদার তালকে তিনি মূর্তি বানিয়েছেন, এখনো সেই চেষ্টা অব্যাহত। ভদ্রলোক টিফিন টাইমেও ছেলেমেয়েদের না করতে পারা অংকের খাতা নিয়ে বসেন, কোনোমতে রুটি তরকারি দিয়ে টিফিন সেরেই খাতার অংক কষতে শুরু করেন। ওনাকে আড়ালে শিক্ষকরা কলিযুগের বিদ্যাসাগর বলে ডাকেন। বয়েস পঞ্চান্ন, বেঁটেখাটো চেহারার, চোখে হাই ফ্রেমের চশমা। ওনাকে সকলেই স্কুলে সাদা শার্ট আর দর্জির দোকানে করানো ব্ল্যাক প্যান্টেই দেখেছেন। একমাত্র স্কুলের জন্মদিনের দিন উনি অন্য রঙের পোশাক পরেন। 

অশেষবাবু গলাটা ঝেড়ে নিয়ে বললেন, তা তোমরা আজ ক্লাসে যাবে না? প্রসেনজিৎ হেসে বললো, আজ তো শনিবার, তাই একটু ঢিলে দিয়েছি অশেষদা। ছেলেমেয়েরাও আজ পড়ার মুডে থাকে না। অশেষবাবু বিষণ্ণ মুখে বললেন, তোমরা পড়ালেই পড়বে। প্রেয়ার শেষে ক্লাসে গিয়ে সব চিৎকার চেঁচামেচি করছে, তোমরা গেলেই মন দেবে নাহলে আর কি! চক, ডাস্টার আর খাতা নিয়ে গজগজ করতে করতে শ্রাবন্তীর দিকে একবার বিরক্তির দৃষ্টি ফেলে নিজে এগোলেন ক্লাসের দিকে। শ্রাবন্তী মুখটা বেঁকিয়ে বললো, এখনো পাঁচ বছর সহ্য করতে হবে এই বিবেকের ধ্বজাধারীকে। নীলিমাদি তাড়াতাড়ি পছন্দ করো বাপু, আমারও জিওগ্রাফি ক্লাস আছে নাইনের, যাই একবার ঢুঁ দিয়ে আসি। ক্লাস নাইন এর স্টুডেন্টদের দেখেছেন মুকুলদা, অতি পাকা সব। ইচ্ছে করে এমন সব প্রশ্ন করে যেন শিক্ষকরা বিপাকে পড়ে। মুকুলস্যার পেনটা পকেটে গুঁজতে গুঁজতে বললো, তা একটু আধটু বাড়িতে পড়াশোনা করুন না, হোমওয়ার্ক বোধহয় সকলেরই দরকার। শ্রাবন্তী শাড়ির আঁচলটা ঠিক করে নিয়ে বললো, ওটাই বাকি আছে! বছর নয়েক চাকরি করার পরে এখন আবার পড়তে বসবো। ছাড়ুন দেখি। সব তো দশটা করে প্রাইভেট টিউশন পড়ে, আমাদের শেখানোর ভরসায় এখন আছেই কে! নীলিমাদি শেষ পর্যন্ত পোড়ামাটি রঙের শাড়িটাই পছন্দ করলো।  বিনায়ক খাতা নিয়ে বেরোনোর সময় আলগা করে বলে গেল, আমার তো ছাত্ররা প্রশ্ন করলেই ভালো লাগে, মনে হয় ওরা পড়ছে। 


ক্লাসে ঢুকেই বোর্ডে অংকের নতুন চ্যাপ্টার বোঝাতে শুরু করলেন অশেষবাবু। এই কালো বোর্ড, সাদা চকের দাগ আর অংকের সংখ্যা - এই গুলোর প্রতি ওনার টান যেন আমৃত্যু থাকবে। সাদা আর নীল পোশাকের একদল ছেলেমেয়ের উজ্জ্বল চোখের দিকে তাকিয়ে বললেন, যার যার বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে হাত তোল শিগগির। এখন সব বুঝেছিস ভাব করে বসে থাকবি আর আমি বেরিয়ে গেলেই এ ওর খাতা টানবি তা হবে না। আমি তোদের মাথায় ঢুকিয়ে তবে যাব। বল কার কি অসুবিধা হচ্ছে? জনা পাঁচেক এগিয়ে এলো সমস্যা বুঝতে। এই তো, অশেষবাবু তো এটাই চান। স্টুডেন্টরা প্রশ্নবানে জর্জরিত করুক। যাতে অশেষবাবুকে গিয়ে বাড়িতেও খাতা পেন নিয়ে মাথা ঘামাতে হয়। ওদের বার কয়েক বোঝানোর পরে বললেন, এবারে তোরা কষে দেখা। ঘন্টা পরে গেল। ধুর, মনে মনে একটু বিরক্ত হলেন অশেষবাবু, এভাবে অর্ধেক রাস্তায় ক্লাস ছেড়ে চলে যেতে বিরক্ত লাগে, তাও বাধ্য হন উনি। 

আরেকটা ক্লাস সেরে টিচার্সরুমে ঢুকে দেখলেন, গল্পে মগ্ন অনেকেই। নয়তো চলছে মোবাইল ঘাঁটা। ওনাকে দেখেই শ্রাবন্তী বললো, আরে অশেষদা খবরটা শুনেছেন তো, আমাদের স্কুল থেকে এবারে একজন জাতীয় পুরস্কার পাচ্ছেন, শ্রেষ্ঠ শিক্ষক হিসেবে। বলুন তো কে? দু সেকেন্ড সময় নিলেন অশেষবাবু, তারপর বললেন, সে যেই পাক, বিজনবিহারী বিদ্যালয়ে ওই পুরস্কার আসবে এটাই তো আনন্দের, বড় গর্বের। কোথায় বেরিয়েছে? কোন খবরে? ইতিহাসের উৎপল ভৌমিক হেসে বললেন, ফেসবুকে স্যার। আপনি তো আবার টেকনোলজি বোঝেন না, তা এখন কি করে দেখবেন? অশেষবাবু আগ্রহের বশেই শ্রাবন্তীর ফোনের দিকে ঝুঁকে বললেন, কই আমার স্কুলের নাম কই? শ্রাবন্তী বললো, এই যে দেখুন, আমি এখুনি আমার টাইমলাইনে পোস্ট করলাম, বিজনবিহারী বিদ্যালয় থেকে যদি একজন শিক্ষককে জাতীয় পুরস্কার দেওয়া হয় তাহলে বেশ ভালো হবে। এই দেখুন, এখুনি ১০০ টা লাইক পড়ে গেছে। অশেষবাবু বিরক্ত হয়ে বললেন, তোমরা না শিক্ষক, এই আচরণ কি শোভা পায়? ছুটির ঘন্টা বাজতেই উৎপল বললো, আরে রাগ করলে চলে অশেষদা, একটু মজা না করলে বাঁচি কি নিয়ে!

উৎপল ছেলেটা মন্দ নয়, তবে সিরিয়াস নয় মোটে। কিন্তু যখন স্টুডেন্টদের পড়ায় তখন বেশ মনযোগ দিয়েই পড়ায়। তাই অশেষবাবু বেশি রাগ করেন না ওর কথায়। 

বাড়ি ফিরতেই দেবযানী বাবার কাঁধ থেকে শান্তিনিকেতনী ব্যাগটা নিয়ে বললো, আজ মুখটা ভার কেন? আজও কি স্কুলে কেউ কিছু বলেছে? নাকি অন্যদের ফাঁকি দেওয়া নিয়ে রাগ হলো? 

সোফায় গাটা এলিয়ে দিয়ে অশেষবাবু বললেন, আসলে কি জানিস, ছেলেরা পড়তে চায় না, শিক্ষকরা পড়াতে চায় না, এ যেন কোনো একটা ভাঙনের স্রোতের দিকে ভেসে চলছে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা। চারিদিকে গজিয়ে উঠেছে কোচিং সেন্টার আর প্রাইভেট স্কুল। মাঝে মাঝে বড্ড কষ্ট হয় রে। নোবেল জব এটা, অথচ দেখ সকলেই কেমন যেন পরের ছেলে পরমানন্দ এই ভেবেই চলছে। কমলাদেবী ঘর থেকে বললেন, আক্ষেপ শেষ হলে সংসারের দুটো কথা বলি? 

অশেষবাবু দেবযানীর দিকে তাকিয়ে বললেন, এই সংসার সংসার করেই তোর মায়ের মাথাটা গেল। দেশ যে কোন পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে আছে বুঝলো না কোনোদিন। এই যে এইটি পার্সেন্ট নম্বর পেয়ে কলেজে ভর্তি হতে পারছে না ছেলেমেয়েরা। এই যে নাইনটি পার্সেন্ট নম্বর পেয়ে আমার সন্তানরা চাকরি পাচ্ছে না, এগুলো যেন কোনো ব্যাপার নয় তোর মায়ের কাছে। শুধু নুন-তেলের হিসেব করে গেল। 

কমলাদেবী খাবারটা টেবিলে রাখতে রাখতেই বললেন, দেবী তোর বাবাকে বল, বিদ্যাসাগরকেও কিন্তু সমাজ ছেড়ে কথা বলেনি। তাই রিটায়ারের আগে আর শত্রু বাড়িয়ে লাভ আছে? কোনদিন কোন ছাত্র দেবে মাথা ফাটিয়ে। ওরে ওকে বল, এখন সবাই ফাঁকিবাজ, তাই দলছুট কিছু দেখলে কেউই সহ্য করতে পারে না। অশেষবাবু হাত পা ধুয়ে টেবিলে এসে বসে বললেন, তাই বলে অন্যায় দেখলেও বলবো না? দেবযানী মুচকি হেসে বললো, মা তোমার কি আর কাজ নেই? তুমি এতদিন ধরে বাবাকে দেখার পরেও পরিবর্তন করবার আশায় এসব বলছো? আচ্ছা বাবা, বলছি তোমাদের স্কুলে কোনো নোটিশ আসেনি? অশেষবাবু খেতে খেতে বললেন, কিসের নোটিশ রে?

দেবযানী চিন্তান্বিত স্বরে বললো, বোধহয় স্কুল বন্ধ হবে। আমাদের কলেজে আজ খুব কড়াকড়ি চলছিল, কড়াকড়ি বলতে বারবার প্রফেসররা এসে বলেছিলেন, কারোর বাড়িতে কোনো গেস্ট এসেছে কিনা অন্য রাজ্য থেকে, এইসব। সম্ভবত কোভিড এর জন্য স্কুল-কলেজ বন্ধ হবে। অশেষবাবু অন্য জগতের মানুষ। দিনরাতের আপডেট থাকে না তার কাছে। ওই জন্যই মুকুল বলছিল, স্কুলগুলো ইমিডিয়েট বন্ধ করা উচিত। হ্যাঁ রে দেবী, এখনো তো উচ্চমাধ্যমিক শেষ হয়নি। আমাদের স্কুলে সিট পড়েনি ঠিকই, কিন্ত...অশেষবাবুর কথা শেষ হবার আগেই টিভির খবরে প্রধানমন্ত্রী বললেন, আগামীকাল রবিবার পূর্ণ দিন লকডাউন থাকবে। 

অশেষবাবু বললেন, এই সময় ছেলেমেয়েগুলো বড় বিপাকে পড়বে রে দেবী! কমলাদেবী বিরক্ত হয়ে বললেন, শুনছো, সবাই বলছে অন্তত একমাসের মুদিখানার জিনিস বাড়িতে স্টক করে রাখতে। তুমি আর দেবী সন্ধেবেলা বেরিয়ে কিনে এনো। আমি লিস্ট করে দিয়েছি। 

দেবযানী মজুমদার ফিজিক্স থার্ড ইয়ারে পড়ছে। বাবার মতোই পড়াশোনা তার একমাত্র নেশা। আরেকটা নেশা হলো কবিতা লেখা। শব্দরা যেন নিজেই এসে ধরা দেয় ওর কলমে। যদিও এসব কবিতা ও কাউকেই দেখায় না, এমনকি ইমনকেও না। ইমন ওর সব থেকে কাছের বন্ধু, তবুও লজ্জা পায় ও। মা বলে দেবযানীর স্বভাব নাকি বাবার মতো। বাবা যেমন পড়াশোনা ছাড়া কিছুই বোঝে না, জগৎ সম্পর্কে উদাসীন, দেবীও নাকি এমনই। ছোট্ট থেকে কেউ যদি বলতো, তুই একেবারে তোর বাবার মতো তাহলে দেবীর খুব আনন্দ হতো। বাবা ওর আদর্শ। মা হেসে বলে, আমি বলেই এমন মানুষ নিয়ে ঘর করি। বইপত্র ছাড়া আর কিছুই চিনলো না। দেবী দেখেছে, মায়েরও আত্মভোলা অশেষ মজুমদারকে নিয়ে প্রচ্ছন্ন গর্ব আছে। যদিও সেটা স্বীকার করে না মা। তবুও এটুকু বোঝার বুদ্ধি আছে দেবীর। ওই জন্যই মা দুহাত দিয়ে আগলে রাখে সংসারটাকে। বাবাকে বেশি জড়াতেই চায় না সংসার নামক যাঁতাকলে। মুখে বলে, ওই মানুষকে বলবো এক, করবে আরেক। তাই নিজেকেই সব কাজ করতে হয়। আসলে মা চায় বাবা থাকুক বাবার সংখ্যাতত্ত্বের ঘেরাটোপের মধ্যেই। 


দেবযানী আর বাবা মিলে গোটা চারেক ব্যাগ নিয়ে বেরিয়েছিল সেদিন সন্ধেবেলা। দেশে খাদ্যাভাব হবার আগেই কিছু স্টক রাখতে। অন্যমনস্ক বাবা রাস্তায় বেরিয়েই বললেন, হ্যাঁ রে দেবী, সত্যিই স্কুল বন্ধ হয়ে যাবে? বলছে তো সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়লে বিদ্যালয়গুলোতে আগে ছড়াবে। দেবযানী দৃঢ় ভাবে ঘাড় নেড়ে বললো, হ্যাঁ, তাই তো বলছে বিশেষজ্ঞরা। 

আনমনা অশেষবাবু ভাবছিলেন, ছেলেমেয়েগুলোর ক্ষতি হবে। এখনো কোনো ক্লাসের কোর্স শেষ হয়নি ফার্স্ট টার্মের, কি যে হবে! খুঁটিনাটি জিনিস কিনে ফিরে এসেছে বাড়িতে। 

কমলাদেবী রাতে ওনার ভাঁজওয়ালা কপালে হাত বুলিয়ে বললেন, এত চিন্তা কেন করছো তুমি? এ সিদ্ধান্ত তো দেশ নেবে, রাজ্য নেবে। তোমার মত হাজার হাজার শিক্ষক তো আছে। তারাও কি রাত বারোটার সময় বসে বসে গোটা বইয়ের অঙ্ক কষতে বসেছে? তাও চার চারটে ক্লাসের কোর্স শেষ করা কি মুখের কথা? অশেষবাবু হিসেব কষতে কষতেই বললেন, তুমি বুঝছো না, নাইন-টেনের বড় ক্ষতি হয়ে যাবে। তাই চেষ্টা করছি ওদের ফার্স্ট টার্মের অঙ্কগুলো অন্তত রেডি করে ফেলি। যদি একান্তই না খোলে তাহলে এই খাতগুলো ওদের দিয়ে দেব। ওরা জেরক্স করে নেবে। চেষ্টাটুকু করি। 

একগুঁয়ে মানুষটা একমনে কষে চলেছেন অংক, পাশে লিখে চলেছেন অঙ্কটি করার পদ্ধতি, যাতে স্টুডেন্টরা সহজেই বুঝতে পারে। রবিবারও একই চেষ্টা অব্যাহত থাকলো অশেষবাবুর। খাতার পর খাতায় স্টুডেন্টদের জন্য অঙ্ক কষে চলেছেন। দেবযানী বাবার এমন আত্মস্থ রূপ দেখতেই অভ্যস্ত, কিন্তু চিন্তান্বিত কপালে একাধিক ভাঁজ দেখে বুকের মধ্যে কেমন একটা মোচড় দিয়ে উঠলো। বাবাকে কোনো কারণে কষ্ট পেতে দেখলে দেবীর ভীষণ কষ্ট হয়। যদিও এর সঠিক কারণ ও জানে না, তবুও এই কষ্টটা ওর সেই ছোট্ট থেকেই হয়। বাবার পাশে গিয়ে বসে দেবযানী বললো, এই যে গুড স্টুডেন্ট, দিনরাত পড়াশোনা করছো মন দিয়ে তাতে আমি খুবই প্লিজড হয়েছি, তাই ভাবলাম তোমার খাটনির একটা অংশ আমিই সলভ করি। 

অশেষবাবু যেন হাতে চাঁদ পেয়ে গেছেন এরকম ভাবে বললেন, তুই করে দিবি? তাহলে ঐ দেখ ওটা নাইনের খাতা, নাইনের কোর্স, শুরু করে দে, আমাকে দেখিয়ে নিবি বুঝলি?

দেবযানী হেসে বললো, বাবা আমি পারবো। আমার দুই টিউশনের স্টুডেন্ট তো নাইনে পড়ে, আমি ওদের সায়েন্স গ্রূপটা দেখি। তাই তুমি নিশ্চিন্তে থাকো মিস্টার মজুমদার। বাবার কপালের চিন্তার ভাঁজটা ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল যেন, দেবী ওর পুরস্কার পেয়ে গেছে। নাইনের কোর্সের অঙ্কগুলো পর পর কষে চলেছে দেবযানী, মাঝে মাঝে বাবাকে দেখিয়ে নিচ্ছে। বাপ মেয়ের যৌথ প্রচেষ্টায় ফার্স্ট টার্মের কোর্সটুকুর ব্যবস্থা করা সম্ভব হলো। বাবা বললো, আগামীকাল স্কুলে গিয়ে খাতাটা দিয়ে বলবো তোরা জেরক্স করে নে। যারা নামি টিউশনে পড়ে তাদের সমস্যা হবে না হয়তো, কিন্তু বাকিরাও তো আছে, তাদের জন্যই এই ব্যবস্থা। 

বিজনবিহারীর ইউক্যালিপটাসের কালচে পুরু সবুজ পাতাগুলো আজও ঘাড় দুলিয়ে ডাকলো অশেষবাবুকে। বিদ্যালয়ে প্রবেশ করেই শুনতে পেলেন বন্ধের নোটিশ কাল থেকে। ওটা দেখে কয়েকজন বাদ দিয়ে বাকি শিক্ষকদের মধ্যে তেমন কোনো হেলদোল দেখলেন না অশেষবাবু। শ্রাবন্তীর একটু মনটা খারাপ। ওর শাড়ির বিজনেসটা মার খাবে স্কুলে না এলে। 

মুকুল জোরদার আলোচনা শুরু করেছে, এখনও ইন্ডিয়ার কিছুই হয়নি, এখন যদি রুখে দিতে পারতো তাহলে ইন্ডিয়া বেঁচে যেত। তবে একবার যদি সংক্রমণ শুরু হয় ভারতে, তাহলে এখানে এত লোকসংখ্যা আর চিকিৎসা ব্যবস্থার এত অব্যবস্থা যে স্বাস্থ্য আর অর্থনীতি দুই ভেসে যাবে পবিত্র গঙ্গায়।

অশেষবাবুর এসব আলোচনা শুনে সময় নষ্ট করে লাভ নেই। উনি ক্লাসে ঢুকে দুদিনের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফসল অংকের খাতাটা আশীষের হাতে দিয়ে বললেন, সবাই জেরক্স করে নিবি। আর বাড়িতে ক্রমাগত প্র্যাকটিস করবি। স্কুল যেদিন খুলবে আমি কিন্তু পরীক্ষা নেব। ছেলেমেয়েগুলো অদ্ভুত ভাবে জিজ্ঞেস করছিল, স্যার বন্ধ কেন হচ্ছে? স্যার কবে খুলবে? কোনো প্রশ্নের সঠিক উত্তর তো অশেষবাবুর কাছেও নেই। অথচ উনি সকলকে সব সময় বলেন, প্রশ্ন করবি বারংবার তবে তো নিজে শিখবি। এই মুহূর্তে এদের অসহায় চোখগুলোর কৌতূহলী প্রশ্নের উত্তর দেওয়া ওর পক্ষে সম্ভব নয়। 


স্কুল বন্ধ হয়ে গেল অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য। বাড়ির ছাদে বিকেল হলেই পায়চারি করেন অশেষবাবু। আর মনে মনে ভাবেন, কবে খুলবে স্কুল। আবার ছেলেমেয়েগুলোর চেঁচামেচিতে কান ঝালাপালা  করার সুখ কবে পাবেন কে জানে। মাসখানেক তো অতিক্রান্ত হলো, সংক্রমণ বাড়ছে বৈ কমছে তো না। কমলা সিরিয়াল দেখে, দেবযানী পড়াশোনা করে, বড্ড একা লাগে অশেষবাবুর। রিটায়ারমেন্টের পরে একটা কোচিং খুলতে হবে, নাহলে পাগল হয়ে যাবেন উনি। পড়ানোটা ওনার নেশা, নেশা ছেড়ে কেউ থাকতে পারে? তাই কোচিং একটা খুলতেই হবে। বাড়ির বাগানের আম্রপালি গাছটাতে মুকুল এসেছে। নতুন বাড়ি করার পরে হঠাৎই একদিন বাজার থেকে আম্রপালি চারাটা এনেছিল বাড়িতে। কমলা দেখেই বলেছিল, বাড়ির মধ্যে ছোট ফুলবাগান ভাল, আমের চারা বসানোর দরকার নেই। অশেষবাবুও মনখারাপ করে বাগানেই চারাটা ফেলে রেখেছিল। দেবী তখন বেশ ছোট, বোধহয় থ্রিতে পড়ে। বাগান খোঁড়া খুরুনি দিয়ে গাছটাকে বাগানের উত্তর দিকে চেপে লাগিয়েছিল। কমলা বোধহয় খেয়ালও করেনি। দেবীই স্কুল থেকে ফিরে মগে করে জল নিয়ে গাছের গোড়ায় জল দিতো। কবে যেন ছোট্ট মেয়েটার পরিচর্চায় গাছটায় দুটো নতুন পাতা বেরিয়েছিল। কমলারও মায়া হয়েছিল, তাই আর তুলে ফেলে দেয়নি। তখন থেকেই নিজের জায়গা ঠিক করে নিয়েছে কলমের আম্রপালিটা। প্রতিবছর নির্দিষ্ট সময়ে মুকুল আসে গাছে। মুকুলের মিষ্টি বুনো গন্ধে মজুমদার বাড়ির বাগান ভরে ওঠে। তারপর আমে ভরিয়ে দেয় নিজেকে। সেদিন থেকেই আম্রপালিটা নিজেকে উজাড় করে দিচ্ছে, বিনিময়ে চায় না কিছুই। অশেষবাবুও চায় বিজনবিহারী বিদ্যালয়ের জন্য নিজেকে ক্লান্তিহীন ভাবে বিলিয়ে দিতে। সবসময় কি বিনিময় প্রথা চলে? ছাত্ররা ওনাকে কি দেবে সেই ভেবে কি আর চললে চলে? ওরা তো অবোধ, ওদের তো শেখাতে হবে তবেই না মানুষ হবে। মুকুল, বিনায়ক, প্রতিমা, রেবা এরাও যথেষ্ট খাটে স্টুডেন্টদের জন্য। কিন্তু কয়েকজন আছে, এটাকে শুধুই চাকরি ভাবে, যেমন শ্রাবন্তী, প্রসেনজিৎ - এদের পড়াশোনা শেখানোর কোনো ইচ্ছেই নেই। বড্ড ফাঁকা ফাঁকা লাগছে অশেষবাবুর। এত দিন ছুটি তো জীবনে নেননি উনি। 

মাসখানেকের ওপরে হয়ে গেল স্কুল বন্ধ, লকডাউনে বাড়িতে বসে আছেন। অসহ্য লাগছে। 

ছাদের এদিক থেকে ওদিক অস্থির পায়ে হাঁটছিলেন অশেষবাবু। দেবী প্রায় হাঁপাতে হাঁপাতে এসে বললো, বাবা বিনায়ক আঙ্কেল ফোন করেছেন, ধরো। না, অশেষবাবুর স্মার্টফোন নেই। মোবাইল ফোনটাই দেবী জোর করে কিনে দিয়েছে, তাই ব্যবহার করেন। ফোনটা কানে চেপে ধরতেই বিনায়ক বললো, দাদা একটা সুসংবাদ আছে। আবার ক্লাস শুরু হবে। বুকের ভিতরটা লাফিয়ে উঠলো অশেষবাবুর। লোকে যতই বলুক শিক্ষকরা বিনা পরিশ্রমে মাইনে পাচ্ছে, খুব আনন্দ হচ্ছে.... আসলে তা নয়। সবাই এই ছুটি এনজয় করতে পারছে না। অশেষবাবুর মত অনেকেই হাঁপিয়ে উঠছেন। বিনায়ক বললো, বাড়িতে বসে বসে মাথাগুলোতে জং ধরে যাচ্ছে দাদা। আর ছুটির দরকার নেই, রক্ষে করো,ওই রবিবারই সই। অশেষবাবু উত্তেজিত কাঁপা গলায় বললেন, কবে থেকে যাবো আবার স্কুল? বিনায়ক হেসে বললো, আপনি কি কিছুই খবর রাখেন না? দিনরাত অংক কষলে হবে? বাকি খবর কে রাখবে? শুনুন, সরকার ঠিক করেছে, অনলাইনে ক্লাস হবে। ভিডিও কলের মত অনেকটা। আপনি ফোনের অন্যপ্রান্তে দাঁড়িয়ে কথা বলবেন, স্টুডেন্টরা যে যার বাড়ি থেকে বসে ক্লাস করবে। আপনার ঘরটা হবে ক্লাসরুম। 

অশেষবাবু ঘাবড়ে গিয়ে বললেন, সে কি, এত দূর থেকে ক্লাস হয় নাকি? ছাত্রছাত্রীদের সমস্যাটা বুঝবো কি করে? ওই ছবিতে দেখে হয় নাকি? বিনায়ক হেসে বললো, হতে হবে। কোভিডের হাত থেকে বাঁচতে হবে তাই এভাবেই পড়াতে হবে। অশেষবাবু একটু গুইগাই করছে দেখে বিনায়ক বললো, নেই মামার থেকে কানা মামা ভালো, বুঝলেন অশেষদা? তা ঠিক। কতদিন পরে আবার কচি মুখগুলো দেখতে পাবেন উনি। আগামীকাল থেকেই ক্লাস হবে। তাড়াতাড়ি বাজারে ছুটলেন, একটা বোর্ড আর মার্কার পেন কিনতে হবে। কিন্তু মুশকিল হলো দোকান বাজার বেশিরভাগ বন্ধ। তবুও পরিচিত দোকানদারকে ডেকে দোকানের ভিতরে ঢুকে কিনলেন প্রয়োজনীয় জিনিসগুলো। এখনো দেবীর কাছ থেকে শিখতে হবে স্মার্ট ফোনের ব্যবহার। কত কাজ এখন ওনার। অবশ হয়ে আসা মনটাতে একমুঠো টাটকা বাতাস এসে প্রবেশ করলো। মধ্যরাত পর্যন্ত দেবী অনেক চেষ্টা করলো বাবাকে স্মার্টফোনের কারিগরি শেখাতে কিন্তু ব্যর্থ হয়ে বলল, তুমি ছাড় বাবা, আমি থাকব তোমার ক্লাসের টাইমে আগামীকাল। দুদিন ইউজ করে দেখ ঠিক অভ্যেস হয়ে যাবে। ঠিক তোমার বারবার অঙ্ক প্র্যাকটিস করতে বলার মত। মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে মুখে হাসি নিয়ে ঘুমিয়ে পড়লেন অশেষবাবু। 


ঘুম থেকে উঠেই হাঁকডাক শুরু করলেন, কমলা আজ স্কুল আছে তো। তাড়াতাড়ি ভাত খাবো। এটা ভেবো না যে আমি ক্লাসের মাঝে খেতে বসবো। তাই বাড়িতে থাকলেও সবকিছু স্কুলের মতই হবে, বুঝলে? কমলাদেবী রান্নাঘর থেকে চেঁচিয়েই বললেন, সকালের চা আর ভাত কি একসঙ্গে দেব? যদি দেরি হয়ে যায়? মায়ের বলার টেকনিকেই দেবী বুঝলো, এবারে লাগবে যুদ্ধ। তাই আবহাওয়ার খবর পেয়েই মাঠে নেমে পড়লো ছাতা নিয়ে। বাবা-মায়ের এমন ঝগড়ায় বরাবরই ও জজের ভূমিকা পালন করে। অশেষবাবু বললেন, তুমি আর কি বুঝবে? মাধ্যমিকের পর তো আর অঙ্ক করোনি। ভয়ে আর্টস নিয়েছিলে বুঝলে? কমলাদেবীও ছাড়বার পাত্রী নন। চায়ের কাপটা টেবিলে রেখে বললেন, ভয়ে নয় গো অমন রসকষহীন সাবজেক্ট আমার মোটেই পছন্দ ছিল না, তাই বাতিল করে ছিলাম। আরেকটা কথা শুনে নাও, লিটারেচার যে পড়েনি তার এমন দশাই হয়। সকাল সাতটা আর সকাল এগারোটার পার্থক্য বোঝে না। দেবীর বেশ হাসি পায় এই ঝগড়া দেখতে। মা আবার বললো, দুই তিন লিখেই তো জীবনটা কাটিয়ে দিলে। বৈষ্ণব পদাবলী থেকে চৈতন্যচরিত্রামৃতের স্বাদ তো পেলে না! অশেষবাবু এবারে নিজের সাবজেক্ট নিয়ে লড়বেন এটা বেশ বুঝতে পেরেই দেবী বললো, বাবা এসবে সময় নষ্ট করার সময় কি তোমার সত্যিই আছে? বোর্ড টাঙাতে হবে, ক্যামেরাটা কোন পজিশনে ধরলে সকলে তোমার বোর্ড দেখতে পাবে সেটাও ভাবতে হবে, তা নয় তুমি এখন চর্যাপদে পড়ে আছো? কমলাদেবী রাগে গজগজ করতে করতে বললেন, চর্যাপদ নিয়ে কথা বলতে আসিস না দেবী, যা জানিস না তা নিয়ে একেবারেই বকবি না। দেবী হেসে বললো, মার্জনা কর মাতে, পাশের বাড়ির চ্যাটার্জী গিন্নির ঝগড়ার চোটে বেচারা কাকগুলো আমাদের পাঁচিলে এসে বসেছিল একটু শান্তির আশায়। ওদের আর কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের পরিবেশ উপহার দেওয়া কি ঠিক হবে? মা ধপাধপ পা ফেলে রান্নাঘরের দিকে চলে গেল, যাওয়ার সময় বলে গেল, বাপ আর মেয়ে দুটোই সমান। 

অশেষবাবু ড্রয়িংরুমের দেওয়ালে বোর্ডটা সেট করে ফেললেন। সামনের সেন্টার টেবিলে রাখলেন বইপত্র। বোর্ডের পাশেই একটা চেয়ার, দিয়ে মুচকি হেসে বললেন, কি রে? লাগছে ক্লাসরুম ক্লাসরুম? দেবী ঘাড় নেড়ে বললো, পারফেক্ট। বাবা তোমার ঐ যে নতুন সাদা জামাটা যেটা নববর্ষের জন্য কিনেছিলাম ওটা বের করে রেখেছি, ওটা পরেই আজ ক্লাস নাও। মুখে অনাবিল হাসি নিয়ে স্নান করতে ঢুকলেন অশেষবাবু। দেবযানীর চোখ দুটো আচমকাই জলে ভরে উঠল। আসলে বাবাকে ও বড্ড ভালোবাসে। হয়তো এমন আনমনা, এলোমেলো বলেই সামলে রাখে। বাবা মানুষটা ভীষণ রকমের সৎ, হয়তো সংসারের অনুপযুক্ত, মায়ের অনেক অভিযোগ তাই বাবাকে ঘিরে কিন্তু তবুও ওই অগোছালো মানুষটা যে জ্ঞানের ভান্ডার এটুকু বুঝেছে দেবযানী। বাবা খুব অল্পেই খুশি হয়ে যায়। এই যেমন অনলাইনে ক্লাস করতে পারবে শুনেই খুশি। 


অশেষবাবু বেশ সেজেগুজে এসেছেন, নতুন জামা পরে ঠিক যেমন স্কুলে যান তেমনি। 

শুরু হলো ক্লাস, দেবী একটা স্ট্যান্ডের ওপরে ফোনটা সেট করে দিয়ে বসে রইল সোফায়। মুখে বললো, ল্যাপটপে ক্লাস করবে বাবা কাল থেকে। ফোনে কিন্তু সমস্যা হবে। বাবার মুখে খুব হাসি, বহুদিন পরে ছাত্রদের দেখতে পেয়েছে বলেই হয়তো। বোর্ডে মার্কার কালি দিয়ে অঙ্ক করাতে শুরু করলো বাবা। বেলটা বাজছে দেখেই উঠে গেল দেবী দরজাটা খুলতে। দরজা খুলতেই দেখলো, ঋদ্ধিমা দাঁড়িয়ে আছে হাসি মুখে। স্কুটি নিয়ে যাচ্ছিলাম, ভাবলাম তোর সঙ্গে দেখা করে যাই লকডাউনের বাজারে। কতদিন কলেজ ক্যান্টিনে বসিনি বলতো? ঋদ্ধিমাকে নিয়ে নিজের ঘরে আসার সময় উঁকি দিয়ে দেখে এলো বাবা মনোযোগ দিয়ে ক্লাস করাচ্ছে ছেলেমেয়েদের। 

কমলাদেবী ঋদ্ধিমাকে দেখেই বললেন, পুডিং খাবি? আমি বানিয়েছি। 

ঋদ্ধিমা আর দেবযানী পুডিং খেতে খেতেই গল্প করছিল দেবযানীর ঘরে। ইদানিং ফোনেই কথা হয় বেশি। বাড়ি থেকে বেরোচ্ছে না বলে জমিয়ে আড্ডাটা বন্ধ আছে। তাই আজকে সুযোগের সদ্ব্যবহার করছে দুজনেই। 


আচমকা ঝড়ের বেগে অশেষবাবু ঢুকলেন। ঋদ্ধিমার দিকে ভ্রূক্ষেপ না করেই দেবীর কোলে মুখ গুঁজে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলেন। বাবার এমন অপ্রকৃতিস্থ ব্যবহার দেখে হতবাক হয়ে গেছে দেবযানী, বিস্মিত ঋদ্ধিমাও। যতবার এই বাড়িতে এসেছে, দেখেছে কাকু অত্যন্ত রাশভারী চুপচাপ মানুষ। পড়াশোনা কেমন চলছে? কেমন আছে? এর বাইরে কখনো কোনো প্রশ্ন করেননি। কাকিমা বরং অনেক গল্প করেন। কিন্তু কাকুকে তো কখনো এমন আবেগী হতে দেখেনি ঋদ্ধিমা। দেবীর ইশারায় যন্ত্রচালিতের মত বেরিয়ে এলো ঘর থেকে। 

দেবী বাবার পিঠে হাত রেখে বললো, তুমি এমন বাচ্চাদের মত কাঁদলে কিন্তু বেশ মজা লাগে আমার। 

মানে আগে তো আমিই তোমার কোলে মুখ গুঁজে কাঁদতাম তাই। বাবার পিঠে হাত রেখেই বুঝতে পারলো সমস্যা অনেক গভীরে। গুমরে কাঁদছে বটবৃক্ষের মত সোজা, সহনশীল মানুষটা। দেবী বললো, মা কিছু বলেছে তোমায়? ঘাড়টা ধীরে ধীরে নাড়িয়ে বললো, না তোর মা নয়। বিশ্বাস কর দেবী ওরা আমার ছাত্রছাত্রী নয়। এদের আমি চিনি না। অঙ্কুশ, দীপায়ন, গার্গী, কোয়েল, শুভজিৎ এরা যেন অন্য মানুষ। কারা এরা? এরা তো আমায় শ্রদ্ধা করে, আমিও তো এদের ভালোবাসি, একমুহূর্তের একটা ছোট্ট ভুলে এতদিনের ভালোবাসা বিশ্বাস শেষ হয়ে যায় নাকি?

দেবযানী বেশ বুঝতে পারলো ক্লাসে কিছু একটা হয়েছে! বাবার চোখের জলটা মুছিয়ে দিয়ে নরম গলায় বলল, ঠিক কি হয়েছে আমায় একটু বলবে বাবা? 

অশেষবাবু ভাঙা গলায় বললেন, ওরা বললো, স্যার আরেকটু ডান দিকে সরে দাঁড়ান দেখতে অসুবিধে হচ্ছে। আমিও ডান দিকে সরে দাঁড়াতে গেলাম, মোবাইলটাও একটু সরাতে গেলাম তখনই ওটা স্ট্যান্ড থেকে উল্টে গেল, আমি অনেক চেষ্টা করছিলাম জানিস ওরা যাতে ঠিক মত দেখতে পায়। কিন্তু ওরা তখন হাসছিল, একদল ছেলে তোর  মোবাইলের স্ক্রিনে হাসছে, হো হো করে বিদ্রুপের হাসি হাসছিল। বলছিল, স্যার শুধু নতুন জামা গায়ে দিলেই হবে, স্মার্টফোন, ল্যাপটপের ব্যবহারও শিখতে হবে তো? ওরা আরও বলছিল, এই জন্যই বলে, অংকের স্যারটা একটা আস্ত মাথামোটা পাবলিক, ডানদিকে সরতে গিয়ে নিজেরই প্যান্ট খুলে গেল! স্যারের মার্কস কাটা হবে টেকনোলজিতে। মার্কস না কেটে স্যারকে ফেয়ারওয়েল দিয়ে দিলে কেমন হয়? 

আমি আর সহ্য করতে পারিনি দেবী। এরা কারা? কাদের আমি শেখাচ্ছি? এরা যদি অংকে একশোতে একশো পায়ও তবুও তো মানুষ হবে না রে। এরা শিক্ষককে মিনিমাম সম্মানটুকু দিতে জানে না। আমি আর ক্লাস করবো না। হয়তো আমাদের কিছুজনের দোষেই এরা এমন বলছে। আমাদের স্কুলের কয়েকজন শিক্ষকের ব্যবহারের জন্যই আজ শিক্ষকের স্থান এদের কাছে এমন। এরাও শিক্ষকদের রুচিহীন ভাবছে। কয়েকজন শিক্ষকের জন্যই আজ আমাদের এই পরিণতি দেবী। কি শেখালাম আমি এদের? 

দেবযানী বাবার মাথায় হাত বুলিয়ে বললো, বেশ তোমায় ক্লাস করতে হবে না। আমি বিনায়ক অঙ্কেলকে ফোন করে জানিয়ে দেব, তুমি নিতে পারবে না ক্লাস। অশেষবাবু উদাসীন চোখে তাকিয়ে থাকলেন বেশ কিছুক্ষণ। তারপর ধীরে ধীরে নিজের ঘরে গিয়ে চুপ করে শুয়ে থাকলেন। কমলাদেবী চা দিতে গেলেও খাননি উনি। সেই একইভাবে মনমরা হয়ে শুয়েছিলেন। 

পরের দিন ক্লাসের সময়ে দেবযানী বিশেষভাবে বলে গিয়েছিল, আজ তুমি ক্লাস করবে না। অবোধ শিশুর মতো ঘাড় নেড়ে বলেছিলেন, বেশ যাবো না। হ্যাঁ রে, ওরা পরীক্ষায় সব পারবে তো? দেবী বিরক্ত হয়ে বলেছিলি, তুমি যাবে না ব্যস। 

অশেষবাবু ফোনটা ঘনঘন বাজছে দেখেই রিসিভ করলেন, শ্রাবন্তী ফোনের অন্য প্রান্ত থেকে টিপ্পনি কেটে বললো, আপনাকে বলেছিলাম অশেষদা, আমার কাছ থেকে টেকনোলজি শিখে নিন, নিলেন না তো? আর আমাদের ক্লাসেও আপনার প্রিয় স্টুডেন্টরা আপনাকে নিয়ে মজা করছে। বলছে, অশেষবাবু ক্লাস করছেন না, শেষ হয়ে গেলেন নাকি? এভাবে বিজনবিহারী স্কুলের নাম ডোবালেন আপনি? এ হে, অশেষদা, এমন করলে হয়?

অশেষবাবু লজ্জায় কুঁকড়ে গিয়েছিলেন শ্রাবন্তীর ব্যঙ্গ শুনে। 

মুকুল ফোন করে অবশ্য অন্য কথা বলছে, মনে রাখবেন অশেষদা, কেউ সব পারে না। শিখে নিলে আপনিও পারবেন। হেড স্যার ফোনে বলেছেন, আপনার জায়গায় অন্য কাউকে ব্যবস্থা করছি আপনি রেস্ট নিন, মনখারাপ করবেন না। 

প্রসেনজিৎ ফোনে বলেছে, আরে অশেষদা, আপনি যদি গেম খেলাটা শিখে নিতেন আমার কাছ থেকে তাহলে আর বেইজ্জত হতে হতো না। আজ দেখলাম বিজনবিহারী বিদ্যালরের শিক্ষকের অজ্ঞতা নিয়ে একটা পোস্টও হয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ায়। ভাবুন তো, আপনার জন্য লোকে আমাদের দিকে আঙুল তুলছে, ভাবছে আমরাও আপনার মতই অজ্ঞ। 

ক্রমাগত আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হচ্ছেন অশেষবাবু। রক্তাত্ব হচ্ছেন অনবরত।  সত্যিই তো ওনার জন্য সমস্ত শিক্ষকদের বদনাম হলো। বিজনবিহারী বিদ্যালয়ের বদনাম হলে ওনার বুকের বাম দিকে চিনচিনে ব্যথা করে। 

প্রায় দিন পনেরো ক্লাস করেননি অশেষবাবু। কেমন যেন উদাস হয়ে তাকিয়ে থাকেন। ছাত্রছাত্রীদের কাছ থেকে অমন শেমিং সম্ভবত মেনে নিতে পারেননি। তাছাড়া দীর্ঘদিনের কলিগরাও তো শোনালেন বেশ কিছু ব্যঙ্গাত্মক কথা। তাই কথাও বলেছেন খুব কম। কমলাদেবী আড়ালে দেবযানীকে বলেছেন, তোর বাবা আর ঝগড়াও করছে না আমার সঙ্গে। এমনকি রুই মাছের মাথা দিয়ে মুগের ডাল করলাম আজ তোর বাবার খুব পছন্দের বলে, সেটাও ছুঁয়ে দেখলো না। দিনরাত তোর পুরনো ফোনটা নিয়ে পড়ে আছে। কি যে দেখছে কে জানে! দেবযানী বললো, আমার কাছ থেকে ল্যাপটপটাও চেয়ে নিয়ে গেছে। দেবী নরম গলায় বলল, আসলে বাবা ছাত্রছাত্রীদের সন্তানতুল্য ভাবে তো, তাই ওদের অপমানটা মেনে নিতে পারছে না। আস্তে আস্তে ঠিক হয়ে যাবে, তুমি চিন্তা করো না। একটু একা থাকতে দাও বাবাকে। কমলাদেবী বললেন, তাই বলে না খেয়েদেয়ে ওই ল্যাপটপ নিয়ে পড়ে থাকবে? এই বয়সে কি ওসব হয়? আমাকেও তো তুই ফোন কিনে দিয়েছিস, ফেসবুক খুলে দিয়েছিস, আমি কি সব পারি? তোর বাবা তো ওসব হাতই দেয় না কোনদিন, এখন কি পারে নাকি? শুধু শুধু শরীরটা খারাপ হবে। দেবযানী বললো, না পারলে ছেড়ে দেবে, এর বেশি ক্ষতি তো হবে না মা? সেই হারটাও বাবাকেই মেনে নিতে দাও। পারবে না বলে বলে বাবাকে হারিয়ে দিও না। 

দেবযানী ধীর পায়ে বাবার সামনে দাঁড়িয়ে বললো, আমি কি হেল্প করবো তোমায়? খুব সহজ, একটু শিখিয়ে দেব? অশেষবাবু নির্লিপ্ত গলায় বললেন, না, তুই যা। বাবার এমন নিরুত্তাপ গলাটা শুনে বেশ কষ্ট হলো দেবীর। বাবা যেন কেমন কঠিন হয়ে গেল এই কদিনে। বিড়বিড় করছে বাবা, মুকুল, উৎপল , বিনায়ক, প্রতিমা এরা বলেছে, অশেষদা মানুষের অসাধ্য কিছুই নেই। প্রতিমা নিজেও স্বীকার করেছে, ও নিজেও কম্পিউটারের কিছুই বুঝতো না। বহুদিন চেষ্টা করে আয়ত্ব করেছেন। স্ক্রিনের দিকে একভাবে তাকিয়ে থাকতে থাকতে চোখে জল এলো অশেষবাবুর। মনে পড়ে গেলো ছেলেমেয়েগুলোর বলা কথাগুলো, স্যারকে এবারে ফেয়ারওয়েল দিয়ে দেওয়া হোক। অশেষবাবু ভেবেছিলেন, ওনার বিদায় দিনে ওনার প্রিয় ছাত্রছাত্রীরা কাঁদবেন, দুঃখ পাবেন। তারা কবে এতটা উৎসুক হয়ে উঠলো ওঁকে ফেয়ারওয়েল দিয়ে দেবার জন্য। প্রসেনজিৎ হয়তো ঠিকই বলে, শূন্যস্থান পূরণ হয়ে যায়, ফাঁকা থাকে না বেশি দিন। তবে যে অশেষবাবুর মনটা এমন হু হু করছে বিজনবিহারী বিদ্যালয়ের ক্লাসরুমের জন্য, কিছুতেই পূরণ হচ্ছে না সেই শূন্যস্থানটা! 


প্রায় দিনকুড়ি পরে দেবযানী দেখলো সম্পূর্ণ অন্য অশেষ মজুমদারকে। ড্রয়িংরুমে টেবিলের ওপর দেবীর ল্যাপটপটা রাখা রয়েছে। অশেষবাবু বেশ খোশ মেজাজে বলছেন, তা বলো, তোমরাই বলো, এই প্যান্ট খোলা স্যারের কাছে অঙ্ক কষবে নাকি তার প্যান্টের দড়ি ধরে টানবে? চয়েস ইজ ইওরস!

ছেলেমেয়েরা একসঙ্গেই বিভিন্ন জায়গা থেকে বলে উঠলো, সরি স্যার, এক্সট্রিমলি সরি। অশেষবাবু বেশ দৃঢ়তার সঙ্গে বললেন, আমাদের সময় অ্যান্ড্রোয়েড ফোন, কম্পিউটার ছিল না, তাই আমরা এর ব্যবহার শিখিনি তেমন। প্রয়োজনও হয়নি। তোমাদের সময় এসব এসেছে তাই তোমরা ভালো ইউজ করতে পারো। কিন্তু মুশকিলটা কোথায় জানো? আমি দশদিন তোমাদের অ্যান্ড্রোয়েড ঘেঁটে এর কারিগরি শিখে নিলাম, আর ক্যামেরা কাঁপবে না। কিন্তু তোমরা দশদিন প্র্যাকটিস করেও অঙ্ক বইটা শেষ করতে পারবে না।  তাই বলে কি আমি তোমাদের ছোট করবো? বলবো কি, তোদের দ্বারা কিস্যু হবে না! বলবো না, কারণ আমি শিক্ষক, আমি শেখাবো। যাইহোক,শুরু করি আজকের ক্লাস, একটু খেয়াল রেখো তোমরা আমার পায়জামার দড়ি যেন খুলে না যায়। তাহলেই হেসে আমায় সচেতন করে দিও। আর হ্যাঁ, আমার ফেয়ারওয়েলের দিন আমি তোমাদের কম্পিউটার ক্লাসটা নেব, আশাকরি শেখাতে পারবো তোমাদের। 


 অশেষবাবু ক্লাস নিচ্ছেন, আর কোনো অট্টহাসির আওয়াজ নেই, দেবী মনে মনে বললো, প্রাউড অফ ইউ বাবা। তুমিই শেখালে হারতে নেই, হারকে জিতে পরিণত করতে হয়, অপমানকে জেদে।


রাকেশ ঘোষাল

Comments

Popular posts from this blog

গ্রীষ্মের_ছুটিতে ছাত্রের লেখা খোলা চিঠি