টেডি বিয়ার
আজ খুব সকালেই ঘুম ভেঙ্গে গেছল নিশানের। মনে হয়েছিল রিয়া যেন ব্যালকনি থেকে ওকে ডাকছে। সূর্য উঠতে এখনো দেরি আছে। সূর্যের লাল প্রভা ছড়িয়ে পড়েছে পূবের দিগন্ত জুড়ে।
সেই আভাতেই অস্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিল ব্যালকনির উপর থেকে ঝোলা হলদে ছোটো পুতুলটা। পুরোনো ফেলে দেওয়া জিনিস দিয়ে খুব সহজেই সৌখিন ঘর সাজানো জিনিস তৈরি করে ফেলতে পারতো রিয়া। এটাও তার মধ্যেই একটা। মেলা থেকে কেনা টিয়া পাখির খাঁচাটা ভেঙ্গে যাওয়ার পরে এই হলদে পুতুলটা সেই খাঁচার তারে বেঁধে ঝোলানো। পুতুল অবশ্য ঠিক নয়, নরম ভাল্লুক পুতুল। এই ফ্ল্যাটে আসার একদম প্রথম দিকেই এটা ঝুলিয়েছিল। রিয়ার খুব পছন্দের ছিল এই রকম পুতুল। বিয়ের পরে প্রায়ই নিশানকে এরকম পুতুল আনতে বলতো কিন্তু ও শুধুই ভুলে যেত নামটা। ঘরে ফিরে বলতো, "তুমি না এতো বড়ো হয়েছো! এখনো পুতুল খেলবে!"
রিয়া গাল ফুলিয়ে বলতো, "কেন! সংসারটা বুঝি পুতুল খেলা নয়..."
নিশান হাসতে হাসতে বলতো, "ওই জন্যেই তো বলি, তোমার পুতুল খেলার সংসার তোমারই থাক.. আমাকে ওর মধ্যে জড়িও না।"
রিয়া বাচ্চা মেয়ের মতো অভিমান করে গাল ফুলিয়ে রান্নাঘরে চলে যেত নিশানের জন্যে চা করতে। তখনও নিশান মনে করতে পারতো না এই নরম পুতুলের নামটা যেন কি! আজও যেমন কিছুতেই মনে করতে পারলো না।
পুরোনো কথা ভাবতে ভাবতে ব্যালকনির ইজি চেয়ারটাতে হেলান দিয়ে বসলো নিশান। মাঝে মাঝে ওর নিজেকে খুব অপরাধী মনে হয়। ভালোবেসেই তো বিয়ে করেছিল রিয়াকে। তবে কেন বিয়ের পরে পাল্টে গিয়েছিল নিশান! রিয়া প্রায়ই বলতো চলো না কোথাও ঘুরে আসি। দমবন্ধ লাগে আমার এই ফ্ল্যাটে।
নিশান মজা করে বলতো, "কেন! তোমার পুতুলরা কথা বলছে না!"
রিয়া উত্তর দিত, "তুমি পুতুল এনে দিয়েছো যে কথা বলবে! এই তো মোটে একটা, তাও ভাগ্যিস বৈরামপুর থেকে এনেছিলাম..."
মাঝে মাঝে নিশান জিজ্ঞাসা করতো, "তা তোমার পুতুল সারাদিন এই ব্যালকনিতে হাওয়া খেলে ঠান্ডা লাগবে না!"
রিয়া হেসে বলতো, "ওর ইমিউনিটি তোমার থেকে বেশি... ও যেমন তেমন পুতুল নয়.."
নিশান প্রতিবারই অফিসের কাজ, ছুটি নেই, টার্গেট পূরণ হয়নি এসব বলে ঘুরতে যাওয়ার প্ল্যান নাকচ করে দিত। রিয়া বুঝতো না এতো শক্ত শক্ত কথা। ওর মন পড়ে থাকতো বৈরামপুরের গাঁয়ে। ওদের এক চিলতে ছোট্ট ঘরে। যেখানে এখানের মতো ঝকঝকে ফ্ল্যাটের দেওয়াল না থাকলেও সকালে বিকেলে তিন চারটে আপন মানুষকে ও দেখতে পেত। বাবা, মা, দিদি আর ভাই নিয়েই ছিল রিয়ার ছোট্ট পৃথিবী। ও বন্ধুদের সাথে মিলে পুতুলের সংসার সাজাতো, রান্নাবাটি খেলতো। সকালে সন্ধ্যেই প্রাণ ভরে খোলা বাতাসে শ্বাস নিত। আর কিভাবেই যেন তার মাঝে নিশান এসে পড়েছিল!
নিশানের কলকাতার ফ্ল্যাটে এই ব্যালকনিটাই ছিল রিয়ার এক চিলতে মুক্ত বাতাসের জায়গা। অফিস থেকে ফিরে এখানেই ওকে বেশিরভাগ দিন আবিষ্কার করতো নিশান। সেইবার যখন নিশান একটা ছুটি পেল, ঠিক করলো ওরা কোথাও ঘুরে আসবে, ঠিক তখনই জানতে পারলো ওদের মাঝে তৃতীয় কেউ আসছে। রিয়া ভেবেছিল এবার নিশ্চয় নিশান ওর বেশি খেয়াল রাখবে, ঘরে একটু বেশি সময় দেবে। কিন্তু ওর ভাবনাকে ভুল প্রমাণ করে নিশান আরো বেশি করে ডুবে গিয়েছিল ওর কাজে। ছোটোবেলা থেকে বইখাতাকে সঙ্গী করে কাটিয়ে দেওয়া নিশান যে হঠাৎ রিয়ার সংস্পর্শে সংসারী হয়ে উঠবে সেই ভাবনাটা রিয়ার ভুলই ছিল। যেই ছেলেটা ছেলেবেলা থেকে জ্যাঠাদের সংসারে অনাদরে বড় হয়েছে বই নামক একমাত্র বন্ধুকে নিয়ে, তার কাছে সংসারের মর্মই বা কতটুকু!
রিয়ার মনের মধ্যে অভিমানরা একটু একটু করে দানা বাঁধতে থাকে। কোনোদিনই জোর করে ও নিশানকে তাড়াতাড়ি ঘরে ফিরতে বলতো না। কিন্তু ওর না আসার অপেক্ষা রিয়ার মনে জমা হতো বিন্দু বিন্দু অভিমান হয়ে। প্রেগনেন্সির প্রতিটা ক্রিটিকেল স্টেজ রিয়া একাই পার করে। রিয়ার মা বলেছিল বৈরামপুরে এসে থাকার কথা, কিন্তু সেদিনও যে রিয়া ছেড়ে যেতে পারেনি ওর নিশানকে, ওর পুতুল খেলার সংসারকে।
নিশান শুনেছিল রিয়া ওর মাকে বলছে, "এমনিতেই সে কাজের মানুষ, আমি ওখানে চলে গেলে আরো বেশি কাজপাগল হয়ে একটা যে সংসার আছে সেটাই ভুলে যাবে।"
সেদিন নিশান শুধু হেসেছিল। অনেক পরে বুঝেছিল এই সামান্য কথাটার মধ্যে কতটা অভিমান, যন্ত্রনা মেয়েটার চাপা ছিল। জিয়া হবার পরে রিয়ার মা কিছুদিন এখানে এসে ছিল। রিয়ার মুখে হাসি দেখে নিশানও একটু স্বস্তি পেয়েছিল। কিন্তু কিছুদিন পরে আবার সেই একাকিত্ব ঘিরে ধরলো ওকে। সংসার সাজাতে যে বড্ড ভালোবাসতো মেয়েটা। শুধু কোনো কারণে নিশানকেই সংসারে বাঁধতে পারেনি। হয়তো অন্য মেয়েদের মতো স্বামীর উপরে হুকুম চালাতে পারতো না বলে।
জিয়া একটু একটু করে বড় হতে থাকে। নিশান আরো বেশি ব্যস্ত হয়ে উঠে অফিসের কাজ, প্রজেক্ট, নিজের টার্গেট নিয়ে। সারাদিনের কাজ শেষে বাড়ি ফিরে নিশান যদি কারো খবর নিত সেটা জিয়ার। রিয়া বলেও যে একটা মানুষ থাকে তার সংসারে, তারও একটা রক্ত মাংসের শরীর আছে, যেটা অসুস্থ হতে পারে সেই ধারণাটা যেন ওর ছিলই না। আসলে একা বড় হতে হতে সংসার কাকে বলে সেই বোধটা গড়ে ওঠার সুযোগই কখনো নিশানের মধ্যে হয়নি।
আর একদিন এলো সেই ভয়ঙ্কর সন্ধ্যেটা। যেদিন হঠাৎ বাড়ি ফিরে দেখলো রিয়া বমি করতে করতে অজ্ঞান হয়ে গেছে, ছোট্ট জিয়া ওর মায়ের মুখে জল দিচ্ছে, কাঁদছে কিন্তু রিয়া উঠছেই না। তড়িঘড়ি ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়ার পরেই জানতে পারলো ব্রেন ক্যানসার লাষ্ট স্টেজ। চোখের সামনে অন্ধকার দেখেছিল নিশান। কিভাবে সব সামলাবে বুঝে উঠতেই পারছিল না। ছোট্ট জিয়াকে কোলে নিয়ে শুরু হয়েছিল এদিক ওদিক ছোটাছুটি। আর একদিন স্তব্ধ হয়ে গেল রিয়ার হৃদস্পন্দন। ভেঙ্গে যেতে বসলো রিয়ার হাতে সাজানো নিশানের সংসারটা। সংসার হারিয়েই প্রথম বুঝেছিল নিশান সংসারের কি মর্ম!
ধীরে ধীরে সূর্য উঠতে শুরু করেছে পূর্বের আকাশে। পুরোনো সব কথা মনে করে চোখ দুটো জলে ভরে গিয়েছিল নিশানের। হাতজোড় করে বারান্দার রেলিঙের কাছে দাঁড়িয়ে বিড়বিড় করছিল নিশান, "আমাকে ক্ষমা করো রিয়া... সেদিন তোমার মনের কথা না বুঝতে পারলেও আজ জিয়ার কথা বুঝতে পেরেছি গো। জিয়া আর রূপন সত্যিই খুব ভালো থাকবে। এবার আমি ভারমুক্ত। সংসার থেকে মুক্তি দাও আমায়। একা একা এইভাবে বেঁচে থাকার শাস্তি আর দিও না আমাকে।"
হঠাৎ পিছন থেকে একটা হাত কাঁধের উপরে পড়লো,
-"বাবা, ঠান্ডাতে কি করছো তুমি? জানো তো তোমার শুধুই ঠান্ডা লেগে যায়.. এতো সকালে উঠলে কেন!"
নিশান ধীরে ধীরে পিছন ঘুরে দেখলো, জিয়া দাঁড়িয়ে আছে। নিশান ওর চোখের কোণাটা মুছে বলল,
-"আর কি জিয়া মা! এই ফাল্গুনে তোদের দুটির হাত এক করে দিলেই আমার শান্তি। এবার সংসারের মায়াটান কাটিয়ে তীর্থযাত্রাতে বেরিয়ে পড়বো।"
জিয়া কোমরে হাত দিয়ে বলল,
-"মানেটা কি! তুমি তো জানো রূপন কিছুই বোঝে না সংসারের... সারাটা জীবন হোষ্টেলে থেকে বড় হয়েছে, তুমি কি চাও আমিও মায়ের মতো..."
জিয়ার মুখটা হাতে করে চেপে ধরলো নিশান। কাঁপা স্বরে বলল,
-"এরকম কথা বলিস না মা.. তোর মা জানলে আমার উপরে খুব অভিমান করবে। বলবে আমি তার সংসারটা গোছাতেই পারিনি..."
জিয়া অভিমানী স্বরে বলল,
-"তবে তুমি বলো, আমাদের সাথে থাকবে.. রূপন, আমি, তুমি সবাই একসাথে... খুব ভালো হবে না!"
ছলছলে চোখে ঘাড় নাড়লো নিশান। মনে মনে ভাবলো রিয়া যদি দেখতে পেত ওর সাজানো পুতুলের সংসারটা আজ এতো বড়ো হয়েছে! আর জিয়া সেই সংসারের কর্ত্রী!
জিয়ার আজ মর্নিং শিফটে ডিউটি। তাড়াতাড়ি বেরিয়ে যাওয়ার সময় বলল,
-"তোমার মনে আছে তো বাবা, আজ কি! বাড়ি ফিরে যেন নতুন একটা টেডি পুতুল পাই প্রতিবারের মতো..."
হ্যাঁ, এতোক্ষণে নামটা মনে পড়লো নিশানের। রিয়ার ওই ভালো লাগার পুতুলটার নাম ছিল টেডি বিয়ার। রিয়া মারা যাবার পর থেকে প্রতিবছর জিয়াকে ওর মায়ের রিটার্ন গিফট হিসেবে একটা করে টেডি উপহার দিয়ে এসেছে নিশান। আর আজ জিয়া সেই বিশাল পুতুল পরিবার সামলাবার দায়িত্বে।
নিশানের ওই পুতুলটার নাম না মনে থাকলেও কখনো দোকানে গিয়ে বলে, ভাল্লুক পুতুল, কখনো টেরি, কখনো বড়ো লোমশ ভাল্লুক, দোকানদার ঠিক বুঝে নেয়।
মারা যাওয়ার আগে নিশানের কোলে মাথা রেখে যখন শেষবার শুয়েছিল রিয়া তখন যে নিশান বারবার অনুশোচনা করছিল, "কেন বলোনি আমাকে! এতো বড়ো অসুখ তবুও... কেন লুকিয়েছিলে!"
ব্রেন ক্যানসার জানবার কিছুদিন পরেই নিশান পেয়েছিল রিয়ার মেডিকেল টেষ্টের রিপোর্টগুলো। প্রেগনেন্সির সময়েই ধরা পড়েছিল অসুখটা। রিয়াই যে ইচ্ছে করে জানায়নি।
রিয়া মৃত্যুশয্যাতেও হাসিমুখে বলেছিল, "তুমি তো আর মনে করে টেডি বিয়ার এনে দিলে না, ভাবলাম আমিই তোমাকে উপহারটা দিয়ে যাই..."
জিয়া বলে ছোট্ট পুতুলটা উপহার হিসেবে রিয়া তুলে দিয়ে গিয়েছিল নিশানের হাতে। যেই পুতুলটাই ওকে এতো বছর ধরে সংসারের মায়াতে বেঁধে রেখেছে। আর রিয়ার কথা ভেবে প্রতিবছর নিশান নিয়ে এসেছে একটা করে পুতুল।
ব্যালকনি থেকে ঘরে ঢুকবার সময় নড়ে উঠলো রিয়ার হাতে সাজানো ভাল্লুক পুতুলের খাঁচাটা। মনে হলো যেন ও বলছে, "এতো সহজে তোমাকে সংসার ছেড়ে যেতে আমি দিচ্ছি না... আমি যখন আছি, তোমাকেও থাকতে হবে এই পুতুল খেলার সংসারে..."
রাকেশ ঘোষাল
Comments
Post a Comment