ওলোট পালোট



রোদ্দুরে হেঁটে হেঁটে মুখ লাল হয়ে গেছে গোপার,  অনেকক্ষণ ঘুরে বাড়িটা খুঁজে পেলো সে। পুরনো দিনের সুন্দর আর বড় দোতলা বাড়ি, ধবধবে সাদা রঙ করা। গেটের গায়ে লেখা ঠিকানাটা মিলিয়ে নিয়ে ভিতরে ঢোকে সে।  বাগানে লাল আর গোলাপি জবা, টগর,  স্থলপদ্ম আলো করে আছে।
বাগান পেরিয়ে ভারি কাঠের দরজায় বেল দিতে  একজন মহিলা দরজা খুললেন, ভারি স্নিগ্ধ, মিষ্টি চেহারা।
“কে?”
“আমি গোপা, আসলে এই বইটা..” গোপা মোটা বাঁধানো বইটা মহিলার হাতে তুলে দেয়।
বইটা খুলে একগাল হাসিতে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠেন উনি,
“ওমা, এটা ফেরত পাবো ভাবিনি,  এসো, ভেতরে এসো মা। কী কাণ্ড! এই দুপুরবেলা বই ফেরত দিতে অনেক হাঁটতে হোলো তো। বোসো মা বোসো।” 
বেলা হয়ে গেছে, অনেক দূর ফিরতে হবে, তবু গোপা মস্ত বড় কার্পেট পাতা বসার ঘরে  গিয়ে সোফায় বসে।  ঘরে অনেকগুলো কাচ দেওয়া আলমারিতে  অজস্র বই। গোপা ইতস্ততভাবে বলে,
“আসলে আমারও একটা বই…”
“জানি তো মা, সেদিন আমার ছেলে বুকাই এই বইটা ফেরত নিতে গেছিলো আমার এক বোনের বাড়ি থেকে, বাড়ি এসে দেখে অন্য বই। একই রকম বাঁধানো বলে কোথাও পালটে গেছে। দাঁড়াও বুকাইকে ডাকি।”
গোপার মুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে, যাক বইটা পাওয়া যাবে। এক বন্ধুর দিদির বই, ফেরত দিতে না পারলে মুশকিল।

বুকাই… বুকাই বলে ডাকেন উনি।
একজন ঘরে ঢোকে, অল্পবয়সী ছেলে, এলোমেলো চুল,  ফর্সা, চোখে চশমা। হাতে একটা বই, বোধহয় পড়তে পড়তে উঠে এসেছে।  এঁকে কোথাও দেখেছে বলে মনে পড়লোনা,  অবশ্য সেদিন গোপা দুটো বাস আর দুটো অটোতে উঠে ছিলো, কে জানে কোথায় বই পাল্টেছিলো।

"বুকাই , দেখ এই মেয়েটি বাড়িতে এসেছে বই নিয়ে, সেই যে তুই হারিয়ে ফেললি। ভাগ্যিস বইতে নাম ঠিকানা লিখে রাখি, তাই ফেরত দিতে পারলো। এই আমার ছেলে বুকাই মানে অরিন্দ্রজিত,  ডাক্তারি পড়ছে। বোসো মা, কিছু মুখে দাও।”
গোপার আপত্তি কানে না তুলেই খাবার এসে গেলো, খিচুড়ি, লাবড়া, পায়েস আর রসগোল্লা।  সুন্দর থালায় সাজিয়ে, ট্রেতে করে দিয়ে গেলো বাড়ির কাজের লোক। গোপা আগে জল খায়, তেষ্টা পেয়েছিলো তার। জলটা ঈষৎ ঠাণ্ডা, কর্পূর মেশানো,  আহা যেন অমৃত পান করলো।

“খেয়ে নাও মা, মুখ দেখেই বুঝেছি খিদে পেয়েছে। আমার রাধাগোবিন্দর প্রসাদ।” 

কতদিন বাদে গোপাকে কেউ খেতে দিলো, আদর করে সামনে বসিয়ে। সত্যিই বড্ড খিদে পেয়েছিলো। সেই সকালে একটা রুটি আর চা খেয়ে গোপা কলেজে বেরোয়। ছোটবেলায় মা মুখ দেখে বুঝতো খিদে পেয়েছে। মা মারা যেতে, বাবা ছোটমাসিকে বিয়ে করলো,  গোপার যত্ন হবে।
ছোটমাসি যত্ন করে শুধু নিজের ছেলে লালকে, গোপাকে চোখে দেখতেই পায়না।

অপূর্ব স্বাদের খাবার তৃপ্তি করে খায় সে, শেষ হতে উঠে দাঁড়ায়, “আজ আসি।”

ওপাশ থেকে বুকাইও ওঠে দাঁড়ায়, মুখে স্নিগ্ধ হাসি,  “আপনার বইটা নিয়ে আসি।”
বই নিয়ে মহিলাকে প্রণাম করে গোপা, “চলি মাসিমা।”
মাসিমা হাসেন, “আবার আসিস মা, এবার মাংস ভাত খাবার, আর গল্প করার নিমন্ত্রণ রইলো। কবে আসবি বলে যা,  মাসিমা কিন্তু অপেক্ষায় থাকবে।”

ঘোরের মধ্যে বাইরে আসে গোপা, সুন্দর বাড়ি,  সুন্দর মানুষগুলো, গোপার জীবন এই সৌন্দর্য থেকে অনেক দূরে। আর দরকার নেই আসার। কী মনে হতে বইটা খোলে ও, ভিতরে একটা চিরকুটে ফোন নম্বর, আর তলায় লেখা “অপেক্ষায় থাকলাম। বুকাই।”

রাকেশ ঘোষাল

Comments

Popular posts from this blog

গ্রীষ্মের_ছুটিতে ছাত্রের লেখা খোলা চিঠি