ভালোবাসার সম্পর্ক



একজন মানুষের অনেক সত্বা বা multy identity থাকে, এটাই স্বাভাবিক। তাই কোন মানুষকে সম্পূর্ণভাবে চেনা সম্ভব নয়। একটা উদাহরণ দিই, এক মহিলা যিনি পেশায় শিক্ষিকা, তিনি যখন পড়ান তখন এক রূপ, বাড়ীতে যখন ঘরকন্না করছেন তখন অন্যরূপ আবার তিনি যখন সন্তানের মা তখন একরূপ আবার তিনি যখন তার মায়ের কাছে যান তখন তিনি শুধু তার আহ্লাদি মেয়ে। এই বিভিন্ন রূপ এতটাই আলাদা যে ব্যক্তি তাকে যে রূপে চেনে, অন্য রূপে দেখলে তার কাছে অচেনাও লাগতে পারে। অর্থাৎ যে ছেলে মা কে স্নেহময়ী রূপে দেখে সেই ছেলে মা কে টিচার হিসাবে দেখলে হয়তো অচেনা লাগবে।বা ধরি একজন পুরুষ, যে অফিসের সামান্য বেয়ারা সে অফিসে চা করা ফাইল বয়ে নিয়ে যাওয়া এইধরনের কাজ করে, সেই লোকের রূপ বাড়িতে এসে বদলে যায়, তখন সে স্বামী, পায়ের উপর পা তুলে বসে থাকবে, বউ চা জলখাবার মুখের সামনে তুলে ধরবে।
ওপরের ভূমিকাটা এইজন্যই করলাম অনেকে দাবি করে যে, সে তার আপনজনকে পুরোপুরি জানে যেটা সম্পুর্ণ ভুল ধারণা। মানুষ চেনা এত সহজ নয়। মানুষের মন বা ভাবনা বদলে বদলে যায় বিভিন্ন পরিস্থিতির ওপর। ধরুন কোনো মানুষ রাস্তা পার হয়ে গিয়ে যদি একটা গাড়ি আচমকা কাছে চলে আসে, লোকটি চিৎকার করে অভিযোগ করে গাড়ি কিনেছে বলে মানুষকে মানুষ জ্ঞান করে না। সেই লোকটিই যখন ভাড়া গাড়ি চেপে যায় আর পাথচারীকে বেমক্কা পার হতে দেখে লোকটি বলে ওঠে রাস্তাটা কি তার বাপের? একই লোক বদলে যায় তার অবস্থানের পরিবর্তনের ফলে। আবার ধরুন আপনি একজনকে সহ্যই করতে পারেন না, আপনার চোখে সে খুব খারাপ লোক, সেই লোকটিই কিন্তু কারো কাছে ভালো। অর্থাৎ দুটোই সত্যি।
কিন্তু অদ্ভুত বিষয় হলো এই সহজ কথা বেশিরভাগ লোকেরা মানতে চায় না। যে সম্পর্ককে আমরা সবচেয়ে বেশি মান্যতা দিই, গভীরতার দিক থেকে, সেটা হলো স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ককে। একটা কথা লোকেরা হামেশাই বলে থাকে, বন্ধু ফন্ধু সব ফালতু, এরা সুখের পায়রা। আসল বন্ধুত্ব হলো স্ত্রী ও স্বামীর বন্ধুত্ব। কিন্তু সত্যিই কি স্বামী স্ত্রী পরস্পরকে চেনে সম্পূর্ণরূপে? আমি মনে করি চেনা তো দূর, চেনার চেষ্টাই করে খুব কম লোক। যে কোনো সম্পর্ক যখন শুরু হয়, সাধারণত তখন আমরা খোলা মনে মিশি, মনের সবকটা জানালা খোলা রেখে। কিন্তু মিশতে মিশতে বুঝতে পারি, পছন্দ অপছন্দগুলো। তখন ফিল্টার লাগাই, ঠিক করে নি তাকে কোনটা বলা যায় আর কোনটা বলা যাবে না। সাধারণ বন্ধুত্বের ক্ষেত্রে এটা মেনে নি স্বাভাবিকভাবেই। আমি যদি কোনো ঘটনা বলতে না চাই আমায় কেউ বাধ্য করে না বলার জন্য। কিন্তু দাম্পত্যে এই স্পেস কেউ কাউকে দেয়না। কারণ আমাদের সমাজে শেখানো হয় স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কোনো গোপনীয়তা থাকা উচিত নয়। শুরু হয় লুকোচুরি, দুজনে দুজনের কাছে গোপন করা, অথচ যেহেতু বিশ্বাস করি দাম্পত্যে গোপনীয়তা থাকা মানেই 'ডাল মে কুছ কালা হ্যায়' তাই শুরু হয় গোয়েন্দাগিরি করা। ভালোবাসার সম্পর্ক হয়ে যায় চোর-পুলিশের সম্পর্কে। আমার খুব প্রশ্ন জাগে, এইরকম চোর-পুলিশের মত সম্পর্ক কি আদপেই সুস্থ সম্পর্ক বলা যায়? আমি কি কারো কলার ধরে হুমকি দিতে পারি যে সে আমায় বাধ্য ভালোবাসতে? শরৎচন্দ্রের একটা উপন্যাসে শিবানীকে যখন আশুতোষবাবু জিজ্ঞেস করেন তুমি বলছো তুমি গন্ধর্ব মতে (সূর্যকে সাক্ষী রেখে) বিবাহ করবে, কিন্তু এই বিয়ে তো সামাজিকভাবে স্বীকৃত নয়, পরে যদি শিবেন অস্বীকার করে? শিবানী হেসে বলেছিল, আশুতোষবাবু, আমার কি একটা দড়ি কলসি জুটবে না? অর্থাৎ বন্ধুত্বকে আইনের সাহায্য নিয়ে টিকিয়ে রেখে কি লাভ। যে সম্পর্কে ভালোবাসা নেই সেটাকে আঁকড়ে ধরে কি পাবো? আমরা যদি সম্পর্ককে একটু শিথিল করতে পারতাম তাহলে কিন্তু জীবন আমাদের সুখের হতো। আমরা যখন বন্ধুদের সাথে মিশি, তখন কিন্তু আমরা জানি এর সাথে কি ধরণের আলোচনা করতে পারি ওর সাথে কি ধরণের আলোচনা করতে পারি। মিশতে মিশতে একটা টিউনিং তৈরি হয়ে যায়। বন্ধুত্বের ক্ষেত্রে আমরা সম্পর্কের সীমা লঙ্ঘন করি না। কিন্তু ভালোবাসার মানুষটির ওপর আমরা সব নিজের ইচ্ছে চাপিয়ে দি, আমার মতে চলতে বাধ্য করি। এই বাধ্যবাধকতা কিন্তু উভয় পক্ষই করে। এটা করতে গিয়ে সম্পর্ককে এত তিতো করে দি যে কোনো কথাই আর থাকে না। বন্ধুত্বের ইচ্ছেটাই চলে যায়। যদিও এইসব দম্পতি শেষ জীবন পর্যন্ত বিশ্বাস করে দুজনেই পরস্পরকে ভালোবাসে। যদিও আমি দেখেছি বেশিরভাগ মানুষ ভালোবাসা বলতে বোঝে, সেবা ধর্ম বা কর্তব্যবোধকে। কেউ কেউ তো আবার বিশ্বাসই করে এইসব ভালোবাসা-টালোবাসা ফালতু। বিয়ে করেছে কেন? বাবা মায়ের বয়স হয়েছে, মা এখন রান্না বান্না করতে পারে না, আমি অফিসে চলে আসলে তাদের দেখার কেউ নেই, তাই আমি বিয়ে করেছি। অনেকে তো এমনও বলে, মেয়েছেলে (আমি জানি অনেক মহিলা মেয়েছেলে শব্দটা শুনেই আমার দিকে আঙ্গুল তুলবেন তবে এমনটাই শুনি এখনো অনেকের কাছে) মেয়েছেলের মত থাকবে। তাদের কাজ ঘর সামলানো সেটা নিয়েই যেন থাকে। আমরা বউদের সুখে রাখি। তাই বউকে গহনা, দামি শাড়ি বছরে দু’বার বেড়াতে নিয়ে যাওয়া সবই তো করি! মেয়েছেলের আর কি চাইবার  থাকতে পারে?
এমনও লোক আছে যারা বিশ্বাস করে, মেয়েদের পায়ের তলায় রাখতে হয়, লাই দিলেই মাথার ওপর ওঠে। আগেকার দিনেই ভালো ছিলো। তাদের যা বলা হতো তাই শুনতো। এখন মেয়েরা লেখাপড়া শিখে নিজেদেরকে কেউকেটা ভাবে। যে দেশে এত পুরুষ বেকার, সেই দেশে বউদের চাকরি করাটা তো একটা ফ্যাশন (এরা এমনভাবে এটা বলে, যেন মেয়েরা কোটায় চাকরি পায়)। চাকরি করলে বউদের মাথা বিগড়ে যায়, ধরাকে সরা জ্ঞান করে।
আর মহিলারা ভালোবাসা বলতে বোঝে, সে সংসারের জন্য কত ত্যাগ করেছে। স্বামী সন্তানকে সুখী রেখেছে। এরমধ্যে বন্ধুত্ব বা ভালোবাসা কোথায়? যদি কোনো দম্পতি বড়লোক হয়, প্রচুর কাজের লোক থাকে, তবে সে ভালোবাসা বোঝাবে কি দিয়ে? 
এই যদি পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের ধারণা হয়, তবে দাম্পত্যে পরে থাকে শুধু অধিকারবোধ আর একসাথে থাকার অভ্যেস বা এক কথায় বলা যায় থাকে অভ্যস্ততার জীবন। এর মধ্যে কোনো ভালবাসা নেই। আমার কাছে একটা প্রশ্ন মাথায় ঘোরে, সবাই যে এত ভালোবাসার কথা বলে, যদি বিপরীত লিঙ্গের মধ্যে যৌনতার সম্পর্ক না থাকতো তবে শুধু ভালোবাসার জন্যই ভালোবাসার সম্পর্কে আগ্রহী হতো কতজন?
.
রাকেশ ঘোষাল

Comments

Popular posts from this blog

গ্রীষ্মের_ছুটিতে ছাত্রের লেখা খোলা চিঠি