ইডিয়েট
-"চোখ বন্ধ করবি না ইডিয়েট। আমার দিকে তাকা, আমার চোখের দিকে তাকা। আমি তো বলছি তুই বাঁচবি। আমি থাকতে কে তোকে মারে দেখি? কষ্ট হচ্ছে? তাতে কি হয়েছে? এর আগে কোনোদিন কষ্ট পাসনি? সারা জীবন কষ্ট নিয়েই বাঁচতে হয়। তাহলে আজ ভয় পাচ্ছিস কেন? কোথাকার কে বললো সব শেষ আর তুই ভাবলি আর বাঁচবি না? আমার উপর বিশ্বাস নেই? আমি তো বলছি তোর কিচ্ছু হবে না ।"
রক্তাক্ত সুকান্তকে ট্রলিতে নিয়ে দৌড়াতে দৌড়াতে বলে চলেছে রূপেশ। কিছুতেই সে সুকান্তকে চোখ বন্ধ করতে দেবে না। তার মনে হতাশার কোনো জায়গা নেই।সুকান্তকেও হতাশ হতে দেবে না। সারাটা পথ তার সাথে একা একা পাগলের মতো বকে এসেছে। হাসপাতালের জরুরী বিভাগের সামনে ট্যাক্সি থেকে নিজে কোলে করে সুকান্তকে ট্রলির উপর নামিয়েছে। জরুরী বিভাগে কর্তব্যরত জুনিয়র ডাক্তার সুকান্তর অবস্থা দেখে রীতিমতো শিউরে উঠেছেন। নিজের অজান্তেই বলে উঠেছেন -"সব শেষ!" তার পর নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন-" তাড়াতাড়ি ওটিতে নিয়ে যান। ডঃ ভট্টাচার্য আছেন, দেখুন। তাড়াতাড়ি নিয়ে যান। একজন থাকুন, কাগজপত্র গুলো তৈরী করতে হবে।"
সঙ্গে সঙ্গে ট্রলি নিয়ে ছুটতে শুরু করে রূপেশ। কয়েক মুহুর্তের মধ্যে সুকান্তকে নিয়ে হাজির অপারেশন থিয়েটারের সামনে।
সুকান্ত ওটির মধ্যে জীবন-মরণের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। ডক্টর ভট্টাচার্যের হাতে দুলছে তার বাঁচা মরা। আর রুপেশ ওটির বাইরে ধর্ণারত ভক্তের মতো অপেক্ষা করছে ভগবানের আশীর্বাদের জন্য। তার এতদিনের এত পরিশ্রম এত স্বপ্ন সাধনা সব মাটি হয়ে যাবে? ঈশ্বর কি তার কোনো চাওয়ার কোনো মূল্য দেবেন না? সুকান্তের জন্য সে তো নিজের জীবনটাকে সঁপে দিয়েছে। আর আজ সেই সুকান্ত যদি চলে যায় তাহলে তার যে সব শেষ হয়ে যাবে।তার মতো দৃঢ় চিত্ত ও অত্যন্ত আশাবাদী মানুষটাও ওটির বাইরে বসে অঝোরে চোখের জল ফেলছে। তবে এ'জল কোন হতাশার জল নয়। তার আকুল প্রার্থনা সর্বময় ঈশ্বরের কাছে -
" হে ঈশ্বর তুমি এ'যাত্রায় সুকান্তকে ফিরিয়ে দাও। না হলে যে আমার অনেক কিছু প্রমাণ করা হবে না।"
চোখ বন্ধ করলেই তার চোখের সামনে ভেসে ওঠে বছর ছয়েক আগের ঘটনাটা। রূপেশ তখন কলেজে পড়ে। প্রতিদিন কলেজ যাওয়ার পথে দেখতো দুটো বাচ্চা ছেলে আর মেয়ে স্টেশনের কাছে প্লাস্টিকের ক্যারি ব্যাগ, বোতল কুড়ায়। একদিন স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে জিজ্ঞেস করলো-
"তোরা লেখাপড়া না করে এইসব কাজ করিস কেন?"
ছেলেটি উত্তর দেয় -"পড়ি তো। এখন আনসার চাচার গোডাউনে এগুলো জমা দিয়ে স্কুলে যাবো। আসার সময় টাকা নিয়ে বাড়িতে ফিরবো।"
-"প্রতিদিন কত টাকা করে পাস?"
-"পনের -কুড়ি টাকা হয়।কোনো কোনো দিন পঁচিশ টাকাও হয়।"
-" টাকাগুলো কি করিস?"
-"ওই টাকাতেই তো আমরা বেঁচে আছি।"
-"মানে?" সবিস্ময়ে প্রশ্ন করে রূপেশ।
বাচ্চা মেয়েটা উত্তর দেয় আমাদের কেউ নেই। দাদা আর আমি স্টেশনেই থাকি। স্কুল থেকে ফিরে দাদা বিশুকাকুর রুটির দোকানে কাজ করে। ওরা রাতে আর দুপুরে দুজনের খাওয়াটা দেয়।রাতে আমি যখন ঘুমিয়ে পড়ি দাদা তখন পড়াশোনা করে।"
বাচ্চা মেয়েটার মুখে কথাগুলো শুনে চমকে উঠলো রূপেশ। এইটুকু একটা বাচ্চা ছেলে সে সারাদিন এত পরিশ্রম করে প্লাটফর্মে শুয়ে রাতে পড়াশোনা করে! আর তার বাবার এত পয়সা তবুও তার পড়াশোনার প্রতি কোন আগ্রহ নেই। বন্ধু-বান্ধবের সাথে হৈ-হুল্লোড় মজা আমোদ প্রমোদে ব্যস্ত। লজ্জায় নিজের মাথাটা হেঁট হয়ে এলো রুপেশের। এরপর প্রতিদিন কিছু না কিছু কথা হয় তাদের সাথে। যত কথা হয় ততই রূপেশ অবাক হয়ে যায়। ছেলেটির নাম সুকান্ত আর মেয়েটি হলো বর্ষা। বর্ষা আসলে সুকান্তর নিজের বোন নয়। বছর দুই আগে ওকে স্টেশনে কাঁদতে দেখে সুকান্ত নিজের কাছে টেনে নিয়েছিল। সেই থেকে তারা দুজন একসঙ্গে থাকে। সবাই জানে ওরা দুজন ভাইবোন। স্কুলের শিক্ষক বিজনবাবু মুগ্ধ সুকান্তর মেধা দেখে। তাঁর উৎসাহেই দুই ভাইবোন স্কুলে যায়, আর সুকান্ত স্বপ্ন দেখে এক উজ্জ্বল ভবিষ্যতের। মূলত বিজনবাবুর উদ্যোগে চতুর্থ শ্রেণী উত্তীর্ণ হওয়ার পর সুকান্ত হাইস্কুলে ভর্তি হয় আর তারপরেই রূপেশের সাথে তাদের যোগাযোগ।
সুকান্তর সাথে পরিচয় হওয়ার পর থেকে রূপেশের মধ্যে একটা অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দিলো। এতদিন সে গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসিয়ে দিয়েছিল। পড়াশোনার ধারে কাছে যেতো না। বন্ধুদের ম্যানেজ করে আর টুকলি করে বছরের পর বছর পরীক্ষায় পাশ করেছে। বাবার অগাধ সম্পত্তি তাই ভবিষ্যৎ নিয়ে তার বেশি মাথা ব্যথা ছিল না।স্কুল কলেজে যাওয়াটা তার কাছে বিনোদনের একটা পথ মাত্র। এহেন বিচ্ছু প্রকৃতির রূপেশ কেমন যেন পাল্টে যেতে শুরু করলো। তার মনে হলো তার নিজের তো আর কিছুই হবে না, কিন্তু সে যদি একটু সাহায্য করে সুকান্তর কিছু হতে পারে। যেমন ভাবা তেমন কাজ। ধীরে ধীরে সে কমাতে শুরু করলো সখ আহ্লাদ। তার নিজের হাত খরচের টাকা থেকে সুকান্তকে বিভিন্ন বইখাতা কিনে দেয়। সময় পেলে তাকে পড়াশোনা দেখিয়ে দেয়। শেষ পর্যন্ত আনসার চাচার অধীনে প্ল্যাস্টিক ও বোতল কুড়োনোর কাজ ছাড়িয়ে দেয়। তার স্পষ্ট নির্দেশ-" তোর টাকা পয়সার কথা চিন্তা করতে হবে না ইডিয়েট। আমি তো আছি।তুই শুধু পড়।"
অবাক হয়ে যায় রূপেশের বন্ধু বান্ধবীরা। পরোপকারী ও বন্ধুবৎসল হিসেবে তার যথেষ্ট সুনাম ছিল তা বলে দুটা পথশিশুর জন্য ও এতটা এগিয়ে যাবে সেটা তারা ভাবতেই পারেনি। ক্রমে কথাটা রূপেশের বাবার কানে পৌঁছায়। আপাদমস্তক হিসেবি ও ব্যবসায়ী মানুষ দীনেশবাবু ক্রোধান্বিত হয়ে বললেন-
"তুমি নাকি আজকাল সমাজসেবা করতে শুরু করেছো? কিন্তু তুমি কি জানো না যে সমাজসেবাটা নিজের রোজগারের পয়সায় করতে হয়? বাবার হোটেলে খেয়ে সমাজসেবা মানায় না।"
-"বাবা, ছেলেটা খুব অসহায়, কেউ নেই।"
-" কেউ নেই তো আমি কি করবো? আমি কি অনাথ ছেলেমেয়েদের জন্য দানছত্র খুলে রেখেছি?"
-"কিন্তু ছেলেটার মাথা খুব ভালো। একটু সুযোগ সুবিধা পেলে একদিন দশজনের একজন হবে।"
-"তুমি ভালো মন্দর কি বোঝো? নিজে কোনোদিন ঠিকমতো সব বিষয়ে পাশ করতে পেরেছো? শুধু আমার ছেলে বলেই মাস্টারমশাইরা বছরে বছরে ক্লাসে তুলে দিয়েছে।"
-"সে আমি জানি বাবা। কিন্তু ছেলেটা সত্যিই ভালো। তোমাকে অতিরিক্ত কিছু দিতে হবে না। আমার হাত খরচের টাকা থেকেই ওকে সামান্য কিছু দিই । তাতেই ওর চলে যায়।"
-"ওসব চলবে না।তোমার হাত খরচের টাকা যোগানোর জন্য আমাকে অনেক ঘাম ঝরাতে হয়, অনেক রক্ত জল করতে হয়। সমাজসেবা করতে হলে নিজের মুরোদেই করো। সামনের মাস থেকে তোমার সব হাত খরচ বন্ধ।"
মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়লো রূপেশের। এরকম দিন যে তার জীবনে আসতে পারে সে কোনোদিন ভাবেনি। কিন্তু আপাত মাথা মোটা এই বিচ্ছু ছেলেটা যেমন সংবেদনশীল ও পরোপকারী তেমনি জেদী। হাল ছাড়ার পাত্র সে নয়, হারার আগে সে হারে না। তাই চ্যালেঞ্জটা সে নিলো। যেভাবেই হোক সুকান্তকে একটা জায়গায় সে পৌঁছে দেবে। সে প্রমাণ করে ছাড়বে যে পাঁকেই পদ্মফুল ফোটে। আর এটা সে করবে সম্পূর্ণ নিজের রোজগারের পয়সায়।
শুরু হলো রূপেশের এক অন্য লড়াই। সকাল বিকাল বাচ্ছা ছেলেমেয়েদের সে টিউশনি পড়ায়। কমে গেলো তার অযথা আড্ডা মারা ও খেলাধূলা। তাকে দেখে দ্বিগুণ উৎসাহে পড়ায় মনোনিবেশ করে সুকান্ত। পরিবর্তন আসতে শুরু করে দুজনেরই জীবনে। রুপেশ এখন সহজেই তার পড়াশোনাটা বুঝতে পারে। সে বোঝাতে পারে সুকান্তকে। সুকান্তও বুঝে গেছে তার রূপদাদার লড়াইয়ের দাম তাকে দিতেই হবে।
বি এ পাশ করার পর রূপেশ একটা কারখানায় কাজ নেয়।তারপরেই সে বিশুকাকুর দোকান থেকে সুকান্তর কাজ ছাড়িয়ে দিয়ে বলে-
"ইডিয়েট, এখন শুধু পড়া আর পড়া। অন্য কোনো কাজ নয়। মাধ্যমিকে তোকে প্রথম দশে থাকতেই হবে।" তার রূপদাদার উপর সুকান্তর গভীর আস্থা। দাদা যখন বলেছে সে নিশ্চয়ই পারবে। অঙ্ক ও ইংরেজির জন্য রূপেশ আলাদা টিউশনির মাস্টার ঠিক করে দিয়েছে। বাকি বিষয়গুলো সে দেখিয়ে দেয়। রূপেশের দুনিয়া এখন শুধুমাত্র সুকান্তকে ঘিরেই। বর্ষা শুধুমাত্র নীরব দর্শক।
মাধ্যমিক পরীক্ষার আর ছয় মাস বাকি। জোর কদমে চলছে প্রস্তুতি। ততদিনে সিলেবাস সব শেষ করে ফেলেছে সুকান্ত। দিনটা ছিল পনেরোই আগস্ট। ছুটির দুপুরে প্ল্যাটফর্মের এক কোনে তার নিজের জায়গায় পড়াশোনা করছিল সুকান্ত। বর্ষা গিয়েছিল পানীয় জল আনতে। হঠাৎ দুই দল দুষ্কৃতীর মধ্যে শুরু হলো মারামারি। এ প্রায় নিত্যদিনের ঘটনা। সুকান্ত সেদিকে ভ্রূক্ষেপ না করে পড়ায় মন দিলো। রেল পুলিশ খবর পেয়ে পৌঁছানোর আগেই শুরু হলো বোমাবাজি। একটা বোমা ছিটকে আসে সুকান্তর দিকে। সেই বোমার আঘাতে মারাত্মক ভাবে জখম হলো সুকান্ত। সঙ্গে সঙ্গেই সে লুটিয়ে পড়ে। বর্ষা কাঁদতে কাঁদতে ছোটে তাদের রূপদাদার কাছে। রূপেশ পাগলের মতো ছুটে এসে সুকান্তকে দেখে চমকে ওঠে। রক্তাক্ত ক্ষতবিক্ষত সুকান্ত যেন শেষ বিদায়ের প্রহর গুনছে। কিন্তু তাকে তো ভেঙে পড়লে হবে না। তাহলে যে সব লড়াই ব্যর্থ হয়ে যাবে। সুকান্তকে নিয়ে ছুটে আসে হাসপাতালে।
ওটির বাইরে অপেক্ষা করতে করতে রূপেশ যেন কোথায় হারিয়ে গেছে। লড়াইটা শুধু তার বাবার বিরুদ্ধে নয়, এ লড়াই তার বিশ্বাসের সপক্ষে। যে ছেলেটা জীবনে কখনো বাজি ধরেনি, সে কিনা এক অনাথ পথচারীর জন্য নিজেকে জুয়ার পণ্য করেছে। যে ছেলেটা নিজে কোনোদিন কোনো পরীক্ষায় পঞ্চাশের উপর নম্বর পায়নি, সে কিনা স্বপ্ন দেখছে এক প্ল্যাটফর্মবাসী মাধ্যমিকে ৯০% নম্বর পাবে! লাস্ট বেঞ্চের ছেলেরাই চিরকাল ফার্স্ট বেঞ্চের ছেলেদের স্বপ্ন দেখার রসদ জুগিয়ে যায়। স্বপ্ন দেখার কোনো সীমা নেই তাই হয়তো দেখাই যায়। কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণের জন্য যে ত্যাগ, সাধনা ও পরিশ্রম করেছে রূপেশ ও সুকান্ত তা চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। অথচ তাদের এতোদিনের এতো সাধনা সব বুঝি বিফলে চলে যাবে....। রূপেশের চ্যালেঞ্জ বুঝি তাকে উপহাসের পাত্রে পরিণত করবে....।
-"এই যে শুনছেন আপনাদের পেশেন্টকে আই সি ইউ তে দেওয়া হয়েছে, চাইলে দেখে আসতে পারেন।"
নার্সের কথায় সম্বিত ফেরে রূপেশের। তাড়াতাড়ি দাঁড়িয়ে উঠে নার্সের হাত দুটো ধরে জিজ্ঞাসা করলো-
" সিস্টার, সুকান্ত এখন কেমন আছে?"
-"আপনাদের পেশেন্ট? ডঃ ভট্টাচার্য বললেন অপারেশন সাকসেসফুল। তবে আটচল্লিশ ঘন্টা পার না হওয়া পর্যন্ত কিছু বলা যাচ্ছে না। এখন ঈশ্বরকে ডাকুন।পারলে উনিই ফেরাতে পারেন।"
আশা নিরাশার দ্বন্দ্বেও রূপেশের চোখে জল এলো। তার বিশ্বাস ছিল সুকান্তর কিছু হবে না। একটা বাঁধা টপকেছে, প্রাথমিক বিপদটা কেটেছে।এবার আরো একটা বড়ো আশঙ্কাকে জয় করতে হবে।মৃত্যুর মুখ থেকে সুকান্তকে ফিরতেই হবে।নাহলে মানুষ পরোপকারের ব্রত ভুলেই যাবে।
আজ মাধ্যমিক পরীক্ষার ফলাফল ঘোষণার দিন। তীব্র উৎকন্ঠা নিয়ে অপেক্ষা করছে সবাই। সুকান্তর থেকে বেশি টেনশনে আছে রূপেশ। হ্যাঁ, মৃত্যুর পরোয়ানা উপেক্ষা করে রূপেশের চ্যালেঞ্জের মূল্য দিতে বেঁচে ফিরেছে সুকান্ত। তবে হাসপাতালের ৩২ নম্বর বিছানাটা দুমাসের জন্য হয়ে উঠেছিল অস্থায়ী পাঠশালা। হাসপাতালের রোগী থেকে ডাক্তার, সুইপার থেকে সিস্টার সবাই দেখেছে একটা মরণাপন্ন রোগী কিভাবে ধীরে ধীরে শুধু সুস্থ হয়ে ওঠেনি সেই সঙ্গে জীবনের প্রথম লড়াইয়ে বিজয়ীর মুকুট পরার জন্য কেমন কায়মনোবাক্যে প্রস্তুতি নিয়েছে । পরের চার মাস প্ল্যাটফর্মে সুকান্তর সাথে জোঁকের মতো লেগে ছিল রূপেশ। তাদের সেই মরণপণ সংগ্রামের ফয়সালা আজ।
সাইবার ক্যাফের সামনে অগণিত ছাত্র ছাত্রী ও অভিভাবকদের ভীড়। সবাই শুধু নিজেদের ফলাফলটা এক ঝলক দেখে নিতে চায়। রূপেশ বার দুয়েক সুকান্তর রোল নম্বর দিয়ে সার্চ করে দেখলো। কিন্তু নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছে না। সে কি ভুল দেখছে? নাকি ভুল রোল নম্বর দিয়ে সার্চ করেছে? সুকান্ত বোবার মতো তাকিয়ে আছে তার রূপদাদার মুখের দিকে। সেদিক থেকে কোনো সদর্থক সাড়া না পেয়ে মুষড়ে পড়েছে সেও। ভালো ফলের ব্যাপারে সে আশাবাদী কিন্তু....। তাহলে কি সব আশা শেষ ! বৃথাই এতো স্বপ্ন দেখা! হঠাৎ রূপেশ দেখলো বর্ষা ছুটতে ছুটতে এগিয়ে আসছে তাদের দিকে। এসে হাঁফাতে হাঁফাতে বললো-
" রূপদা, টিভিতে দাদার ছবি দেখাচ্ছে!"
-"কোথায়?"
-"ওই তো বিশুকাকুর দোকানে দেখলাম। দেখার জন্য লোক ভর্তি হয়ে গেছে।"
-"তাহলে আমি ঠিকই দেখেছি! কিন্তু বিশ্বাস করতে পারছিলাম না।"
সবিস্ময়ে সুকান্ত জিজ্ঞাসা করে-"তার মানে? তুমি কি দেখেছো রূপদা?"
-"ওরে ইডিয়েট তুই ৯৫% নম্বর পেয়ে সেকেণ্ড হয়েছিস!"
সে কথা শুনে সুকান্ত কি করবে ভেবে পেলো না।সবার আগে জীবনে প্রথম বারের জন্য রূপেশকে প্রণাম করতে গেলো। রূপেশ তাকে আটকে বলে-
" ওরে ইডিয়েট তোর জায়গা আমার বুকে। তুই আমাকে জিতিয়ে দিয়েছিস।"
সুকান্তকে বুকে জড়িয়ে পরম তৃপ্তিতে রূপেশ সজোরে একটা চিৎকার করে উঠলো। তার মনের যত যন্ত্রণা, কষ্ট, হতাশা, লড়াই, না বলা প্রতিজ্ঞা সব যেন আকাশ বাতাস ভেদ করে মহাশূন্যের দিকে ধেয়ে গেলো। বাঁধ মানছে না তার চোখের জল। চোখের জল ঝরিয়ে যে এতো তৃপ্তি সে এর আগে কোনোদিন বোঝেনি। কাঁদছে সুকান্তও। তার মনে একটাই শান্তি যে তার রূপদাদাকে সে হারতে দেয়নি। রূপেশ আর সুকান্তর অবস্থা দেখে হতবাক বর্ষা। খুশিতে সেও নাচছে তবে তারও চোখের কোণে জল।
সুকান্ত ও বর্ষাকে নিয়ে রূপেশ এগিয়ে গেলো বিশুকাকুর দোকানের দিকে। এই সেই দোকান যেখানে একসময় সুকান্ত ক্রেতাদের মুখের সামনে রুটি-তরকারির প্লেট এগিয়ে দিয়েছে। সেখানে এখন লোকে লোকারণ্য। এলাকার ছেলে সুকান্তর সাফল্য তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়েছে সবাই। বিপিন খুড়ো কানে একটু কম শোনেন । তিনি বললেন-
"ও বিশু, টিভির আওয়াজটা একটু জোরে দাও না।"
টিভির আওয়াজ বাড়ালো, সেই সাথে বাড়ছে জনরবও। রূপেশরা সেখানে উপস্থিত হতেই জনজোয়ার ধেয়ে এলো তাদের দিকে। কেউ কিছু বোঝার আগেই সুকান্তকে সবাই তুলে নিয়েছে সবার কাঁধে। তাকে নিয়ে আনন্দে মেতে উঠেছে সবাই। হাসি ধরে না বর্ষার মুখে। এতো সুখ ছিল তাদের জীবনে সেটা তারা কোনোদিন স্বপ্নেও ভাবেনি। রূপেশ আর চোখ মুছে মুছে পারছে না। রুমালটা ভিজে গেছে। এখন আর চোখের জল লুকানোর কোনো ইচ্ছা নেই। লবনাক্ত ধারা তার মতো বয়ে চলেছে।
স্কুলেও সুকান্তকে নিয়ে চললো বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস। বন্ধু, সতীর্থ ও শিক্ষক মহাশয়দেরও খুশির অন্ত নেই। ইতিমধ্যে মিডিয়া চলে এসেছে স্কুলে। তারা কথা বলতে চায় কৃতি ছাত্রের সাথে। সুকান্ত সবিনয়ে বললো-
" এখানে যা বলার আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষক মহাশয়গণ বলবেন। ওনারা সুযোগ দিয়েছিলেন বলে আমার মতো এক সর্বহারা মাধ্যমিক পরীক্ষা দিতে পেরেছে। "
কিন্তু মিডিয়া কেন তাকে ছাড়বে? তারা বুঝে গেছে সুকান্তর খবর পাবলিককে ভালো খাওয়ানো যাবে। তাই তারাও নাছোড়বান্দা। শেষে সুকান্ত বললো -
"আমার যা বলার আমি প্ল্যাটফর্মে গিয়ে বলবো। ওটাই আমার আসল মন্দির, ওখানেই আমার ভগবান দিনের বেশিরভাগ সময়টা আমার সঙ্গে থাকেন। ওনাকে ছাড়া আমি কিছু বলবো না।"
প্ল্যাটফর্মের এক প্রান্তে প্লাস্টিকের উপর বসে আছে সুকান্ত। তার দুই পাশে রূপেশ আর বর্ষা। আর তাদেরকে তাক করে আছে একাধিক চ্যানেলের অসংখ্য ক্যামেরা। সুকান্ত ধীরে ধীরে বলতে শুরু করলো-
" আজ যে আপনারা এখানে এসেছেন এর কারণ কিন্তু আমি নই, এর কারণ এই মানুষটা। আমার রূপদা।" তার বাম দিকে বসা রূপেশকে দেখিয়ে দিলো সুকান্ত। তারপর বললো-
" রূপদা ছিল বলেই আমি আজ এই জায়গায় আসতে পেরেছি। নাহলে হয়তো কবেই অন্ধকারে হারিয়ে যেতাম। রূপদা আমার জন্য যা করেছে তা কোনো বাবা তার সন্তানের জন্য করে কিনা আমি জানিনা ।"
তাকে বাঁধা দিয়ে রূপেশ বলে-
"তুই থামবি ইডিয়েট?"
-"আজ আমাকে একটু বলতে দাও রূপদা। তুমি তো আমাকে সব দিয়েছো। কাজ ছাড়িয়ে বাঁচার নতুন পথ দেখিয়েছো। এমনকি মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরিয়ে এনে নতুন জীবন দিয়েছো। বিনিময়ে তোমাকে আমি কি দিয়েছি বলো? আজ সবার সামনে আমার ভগবানকে একটু পরিচয় করিয়ে দেওয়ার সুযোগ দাও।"
-"ওরে পাগল তুই কি বুঝবি তুই আমাকে কি দিয়েছিস ? তোর জন্য আমি মাথা উঁচু করে সামনে তাকাতে পারছি। প্রাণ ভরে মুক্ত বাতাস থেকে অক্সিজেন নিতে পারছি। এর মূল্য তুই কি বুঝবি?"
বিভিন্ন চ্যানেলের তুখোড় রিপোর্টাররা পর্যন্ত কথা হারিয়ে ফেলেছে। প্রশ্ন করা ভুলে শুনে যাচ্ছে সুকান্ত ও রূপেশের কথা।সুকান্ত তখনো থামেনি। সে বলে চলেছে-
" এই মানুষটা শুধুমাত্র আমাকে পড়ানোর জন্য ধনী বাবার অট্টালিকা ও বিলাসবহুল জীবন ছেড়ে কারখানায় কাজ করছে। নিজের জীবনের সব সুখ স্বাচ্ছন্দ্যকে বিসর্জন দিয়েছে। তাই আমার মতো পথচারী আজ আলোর দেখা পেয়েছে। এখন আপনারা বলুন কার সাক্ষাৎকার নেবেন? আমার না রূপদার?"
-"তুই থামবি ইডিয়েট?"
-" হ্যাঁ রূপদা আমি ইডিয়েট। আশীর্বাদ করো সারা জীবন যেন তোমার কাছে ইডিয়েটই থাকতে পারি।"
-"দূর পাগল, ওটা তো কথার কথা। তুই তো রত্ন রে। ইডিয়েট বলিস আর গুবলেট বলিস ওটা তো আমি নিজে। সারাজীবন খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে পাশ করেছি।তুই আমার সেই আক্ষেপ দূর করেছিস।"
দীর্ঘ সাক্ষাৎকারের শেষে ফিরে গেলো সবাই। রাত বেড়েছে। প্ল্যাটফর্মে বিশ্রাম নিচ্ছে সুকান্ত আর বর্ষা। বাড়ির পথ ধরলো রূপেশ। যুদ্ধ জয়ের স্বস্তি নিয়ে ফিরছে ঘরে। সে প্রমাণ করতে পেরেছে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য রক্তের সম্পর্ক লাগে না, একটা সংবেদনশীল হৃদয় লাগে। নিঃস্বার্থভাবে কিছু করলে তার ফল কখনো খারাপ হয় না। কিন্তু এখানে থেমে গেলে চলবে না। আগামী কাল আবার সূর্য উঠবে, নতুন সকাল হবে। সুকান্তকে নিয়ে নতুন লড়াই শুরু করতে হবে। তাকে নিয়ে যে অনেক দুর্গম পথ পাড়ি দিতে হবে। একটা জয় যে আরো অনেক বড়ো যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়ার প্রেরণা যোগায়, আরো অনেক দায়িত্ব বাড়িয়ে দেয় l................
রাকেশ ঘোষাল
Comments
Post a Comment