ফাঁসি



ফাঁসি দেওয়ালের দিকে তাকিয়ে হাঁসছিস কেন?"
"হাসি পাচ্ছে স্যার,নিজেকে অনেকটা হালকা লাগছে,ঠিক যেমনটা মাধ্যমিক দেওয়ার পর লেগেছিল"
"তোর লজ্জা করছে না,তোর তো অপরাধের শেষ নেই,ড্রাগস পাচার,অস্ত্রপাচার, রেপ আবার....
সেই সাথে
তিন-তিনটে খুন করেছিস তুই"
"লজ্জা?লজ্জা আমার কেন হবে স্যার?লজ্জা তো হবে আপনার,আপনাদের এই সমাজের"
"থাম,এত রাতে তোর থেকে জ্ঞান শুনতে চাই না,কাল ভোরে সূর্য ওঠার আগে স্নান করে নিবি,ফাঁসির সময় পিছনো যাবে না"
"আচ্ছা স্যার,আরো তো বাইশটা দেশে ফাঁসি হয়,ওই সব দেশেও কি এই নিয়ম?
"তোর ওতো জেনে কি হবে?....তোর মতো ছেলেগুলোর জন্য সমাজটা বিষিয়ে যাচ্ছে,আমার নিজের ছেলেটা ক্লাস 10এ উঠলো,ওকে নিয়ে ভয় হয়ে,তোর মতো না হয়ে যায়"
"কেউ কি আর ইচ্ছে করে এ পথে আসে স্যার?"
"তোকে কে আসতে বলেছিল,বলি সৎপথে কি বাঁচা যায় না"
"বাঁচতে দিলেন কই স্যার,বাঁচতে তো আমিও চেয়েছিলাম"       
                                         
"বাপটা যখন মারা গেল তখন আমার বয়স ওই পনেরো,পাটকলে কাজ করতো,কদিন আগে দিদির বিয়েতে সব টাকা খরচ করে ফেলেছিল,ধারও করেছিল অনেক,হটাৎ একদিন পাটকলে লকআউট হলো,আর বাড়ি ফেরেনি,দুদিন পর বাপের লাশটা ট্রেনলাইনে পড়ে থাকতে দেখেছিলাম,,,

মা একটা ভাতের হোটেলে কাজ করে কটা টাকা পেতো, আমিও দুবেলা একটা চায়ের দোকানে কাজ করছিলাম,কোনোরকমে দিন চলে যাচ্ছিল,সবাই বলেছিল মাধ্যমিকটা ভালো করে দে,অনেক ভালো ভালো কাজ পাবি,দত্ত কাকু তো পিঠ চাপড়ে দিয়ে বলেছিল-পরীক্ষাটা ভালো করে যে,আমার ইটভাটায় হিসেব রাখার কাজটা তোকে দেবো,আমিও স্বপ্ন দেখেছিলাম ,এর ওর থেকে বই জোগাড় করে পড়ে পরীক্ষা দিয়েছিলাম,নম্বর ও খারাপ পাইনি স্যার,আমাদের বস্তিতে কেউ কোনোদিন ওতো নম্বর পায়নি,কিন্তু তারপর থেকে দত্তকাকু আমাকে দেখলেই ওই কালো গাড়িটার কাঁচ তুলে দিয়ে চলে যেত,একদিন কাছে গিয়ে বলেছিলাম-কাকু চাকরিটা?
-ওসব চাকরিবাকরি হবে না,
বলে একটা একশো টাকার নোট ছুঁড়ে দিয়ে বেরিয়ে গেছিলো

এদিকে মায়ের শরীর টাও খারাপ হল,আর দুবেলা হোটেলে কাজে যেতে পারতো না,আমি একটা ভালো কাজের জন্য দিনরাত ছুটতাম,সবাই বলতো কলকাতায় কাজের ছড়াছড়ি,কিন্তু গিয়ে দেখলাম ওরা তো একটা দারোয়ানের কাজের জন্যও ঘুষ চায়,
আমাদের পাড়ার সব ছেলে,শনিবার রাতে মুন্নিবাই এর কোঠায় যেতো, আমি একদিনও যায়নি,অনেক কষ্টে টাকা জমাচ্ছিলাম,ঘুষ দিয়ে হলেও যদি চাকরিটা হয়ে যায়,মা কে জানায়নি,আমার একমাত্র আংটিটা বেচে দিয়েছিলাম,টাকাগুলো নিয়ে কলকাতা যাবো,বেরোতে যাচ্ছি,দেখি দিদি কাঁদতে কাঁদতে ঢুকলো,শশুরবাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে,বিয়ের সময় টিভি দেওয়ার কথা ছিল,দেওয়া হয়নি,তাই,,,
ওর মুখ দেখে খুব কান্না পাচ্ছিল,টাকাগুলো ওর হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললাম-বাড়ি ফিরে যা,ওর কালো ঠোঁটের কোনে একচিলতে হাঁসি ফুটে উঠেছিল,

ওইদিন রাতেই প্লাটফর্মে একা বসে ছিলাম,তপনদা এসে বললো -কাজ করবি?
-কি কাজ?
-চল বলছি
আমাকে নদীর ধারে একটা ভাঙা বাড়িতে নিয়ে এলো,ঘরে আরো তিনজন বসে তাশ খেলছিল,পরে জেনেছিলাম ওরাও তপনদার আন্ডারে কাজ করে,সবাই তো এটাকে ভুতের বাড়ি বলত,সন্ধেবেলা নাকি নানারকম শব্দ শোনা যায়,তার মানে এরাই শব্দগুলো করে,ভুত-থুত কিছু না,

তপনদা হাতে একটা সুটকেস ধরিয়ে দিয়ে বলল -কাল সকালে এটা কলকাতায় পৌঁছে দিয়ে আসবি,টাকা পাবি-বলে একটা ফোন নম্বর দিয়েছিল,
সুটকেস টা খোলার  কৌতূহল বা সাহস কোনোটাই হয়নি,টাকার কথা শুনে মনে পড়েছিল মায়ের ওষুধটা কিনতে হবে,পরশু শেষ হয়ে গেছে,
পরদিন সকালে কলকাতায় একটা লোককে ওটা দিয়ে এসেছিলাম
তপনদা হাতে কটা টাকা ধরিয়ে দিয়ে বলেছিল,-সাব্বাস,এরকম আরো অনেক কাজ করতে হবে,
এরপর প্রায়ই ওরকম একটা করে সুটকেস বিভিন্ন ঠিকানায় পৌঁছে দিতাম, ততদিনে বুঝেছিলাম যেটা করছি সেটা খারাপ কাজ ,কিন্তু কতটা খারাপ?বুড়ি মা কে অভুক্ত রাখার থেকে নিশ্চই খারাপ না.....

তারপর একদিন তিনদিনের জ্বরে মা টাও মরে গেল,ডাক্তার বদ্যি সব করেছিলাম,কিছু হয়নি,বিশ্বাস করুন স্যার,চিতার সামনে দাঁড়িয়ে একটুও কাঁদিনি,বাপ মারা যাওয়ার পর থেকে মাকে যতটা কষ্ট পেতে দেখেছি,সে কষ্টের থেকে এ বেশি না,,,

তারপর একদিন তপনদা ফোন করে ডাকলো,বলল দরকার আছে,বড় কাজ,গিয়ে দেখলাম আমার বয়সী একটা মেয়ে চুড়িদার পরে দাঁড়িয়ে আছে,মেয়েটার মুখে অসহায়তা ছাড়া আর বিশেষ কিছুই চোখে পড়লো না,তপনদা বললো-এ আশা,একে নিয়ে কলকাতা যা,একটা হোটেলের ঠিকানা দেবো,একটা লোকের সাথে দেখা করবি আর ও যে সুটকেসটা দেবে নিয়ে আসবি,হোটেলের রুমে ওই অজানা লোকটার সাথে ঢোকার সময় আশার করুন চোখে অসহায়তার পাশাপাশি লজ্জা লেগে ছিল,,,
তারপর ফেরার পথে আশার মুখেই শুনেছিলাম ওর ইতিহাস,বাস একসিডেন্টে বাবা মা মারা যায়,জেঠুরা বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেয়,অনেক জায়গায় ঘুরে শেষে তপনদার হাতে পড়ে, সেই দিনই ওর প্রতি একটা করুনা হয়েছিল,কখন যে সেটা ভালোবাসা হয়ে গেছিলো বুঝতে পারিনি,অনেকগুলো সন্ধ্যে ওর সাথে নদীর ধারে বসে কাটিয়ে দিয়েছিলাম,তপনদা কে না বলে ওকে নিয়ে একবার কলকাতা গেছিলাম,বড় দোকান থেকে ওকে জুতো কিনে দিয়েছিলাম,তারপর গঙ্গার ধারে বসে ওই গোলাপিসাদা icecream খেয়েছিলাম,খেতে খেতে আমার icecream টা মাটিতে পড়ে গেছিলো,আর তখন ওর সেই হাসিটা আজও যেন চোখের সামনে ভাসছে,জানতাম ও আমাকে ভালোবেসে ফেলেছিলো,কিন্তু কারোরি আর বলা হয়ে ওঠেনি,বলেই বা কি লাভ,এই ভালোবাসার তো কোনো পরিনাম ছিল না...

শেষ দিনটা ও আমাকে ওই ভাঙা বাড়ির পিছনে ডেকেছিল,বলেছিল আমার জন্য নাকি নিজে হাতে কি বানিয়েছে,যেতে একটু দেরি হয়ে গেছিলো,গিয়ে দেখি ছেঁড়া চুরিদারটার পাশে ওর লাশটা পড়ে আছে,পাশে বসে জানোয়ারগুলো মদ খাচ্ছে বেহুঁশ হয়ে,ব্যাপারটা বুঝতে একটু সময় লেগেছিল,বুঝে ওঠার পরই মনে পড়লো ঘরের কোনায় একটা সুটকেস রাখা আছে,কাল কলকাতায় ডেলিভারি দেওয়ার কথা,ওটা খুলে একটা পিস্তল বের করলাম,গুলি চালানো টাও তপনদাই শিখিয়েছিল,,,

তা ভালোই করেছি,আপনাদের পুলিশ তো ওদের গ্রেপ্তার করে জেলে বসিয়ে খাওয়াতো, কতদিনে ওদের বিচার হবে ততদিন আমি আশার আত্মাকে মুখ দেখাবো কি করে?আর জানোয়ারগুলোকে নিজে হাতে না মারলে আমার শান্তি হতো না,পুলিশকে ধরাটাও সহজেই দিলাম,কি হবে বেঁচে থেকে,যেখানে আমার আশাই নেই,সবাই জানে আশার মৃত্যুর জন্য আমি দায়ী,আমিও কাউকে কিছু বলিনি,বলে কি হবে?আপনারা অসহায় মেয়েটাকে নিয়ে কাদা ছেটাবেন, মেয়েটা মরেও শান্তি পাবে না,তার থেকে ভালো সবাই আমাকে দোষী ভাবুক,আশা তো সত্যিটা জানে,তাহলেই হবে,,,,

আর হ্যাঁ স্যার,আপনার ছেলের তো ক্লাস 10 হলো,দেখবেন স্যার যাতে আমার মতো না হয়ে যায়,"
 

"চোখে আবার কি পড়লো কে জানে, যাই রুমালটা নিয়ে আসি,,,
আর ভোর হতে চললো, তুই তৈরি হয়ে নে"..।।।

রাকেশ ঘোষাল

Comments

Popular posts from this blog

গ্রীষ্মের_ছুটিতে ছাত্রের লেখা খোলা চিঠি