বাস্তব টা বড়ই কঠিন
শ্রীচরণেষু বাবা,
কাল সমীর কাকুর ফোনে জানলাম তুমি আর মা নাকি অত্যন্ত মানসিক বিষাদে ভুগছ। আরও সেই কারণেই নাকি মা আজকাল ঘনঘন নানারকম অসুখ বিসুখে ভুগছে। তোমারও শরীর বিশেষ ভালো নয়। স্কাইপে নয়, মা আমাকে সাক্ষাত সামনে পেতে চায়। কাকু কাল আমায় অনেক বোঝালেন যে আমি তোমাদের একমাত্র সন্তান হিসেবে আমার তোমাদের প্রতি কী কী করণীয় ইত্যাদি ইত্যাদি। সমীর কাকু বয়সে আমার পিতৃতুল্য, তাই তাঁর সাথে তর্ক করা আমি সমীচীন বোধ করি নি। কিন্তু তোমাদের একমাত্র সন্তান হিসেবে তোমার কাছে আমার প্রশ্ন – আচ্ছা বাবা, একটা কোম্পানিতে চাকরি করি;বিদেশে থাকি। অনেক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব কাঁধের ওপর চাপানো আছে। হুট করে বললেই কি তোমাদের পাশে গিয়ে দাঁড়াতে পারি? আর যদি দেশেরই অন্য কোনো প্রান্তে চাকরি করতাম, তাহলেও কি সেটা সম্ভব হত? আমাদের নীলুমাসী যখন আইসিইউ তে ভর্তি ছিল, ব্যাঙ্গালোর থেকে বুবুনদা দুদিন পর এল। সেদিন সকালেই নীলুমাসী ইহলোকের মায়া কাটিয়ে চলে গেছে। বেচারা বুবুনদাকে কত বাক্যবাণ শুনতে হয়েছিল তার সাক্ষী ছিলাম টুয়েলভের ছাত্র আমি। কান্ট্রি ম্যানেজার বুবুনদা অপরাধীর মতো বলেছিল, “কী করি বল তো? পরশুই বড়কর্তা জার্মানি থেকে এসে পৌঁছোলো। ছেড়ে এলে চাকরি চলে যেত। এই বয়েসে এমন চাকরি কোথায় পাব? দুটো ছেলে মেয়ে স্কুলের খরচা বছরে আড়াই লাখ। চাকরি না থাকলে কোত্থেকে জোটাবো”? আজ আমি বুবুনদার অবস্থা ভালোই বুঝতে পারি। দেশে অথবা বিদেশে – উচ্চ শিক্ষিত উচ্চ প্রতিষ্ঠিত ছেলেদের বাপ-মা, আত্মীয় স্বজন, সবাই কত সহজেই না ছেলেদের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দেয়। ‘অকৃতজ্ঞ’, ‘স্বার্থপর’ – আরো কত সুন্দর সুন্দর তকমা আমরা পাই। আচ্ছা বাবা, তোমার কি মনে পড়ে আমার কোনো পরীক্ষায় খারাপ রেজাল্ট হলে তুমি আর মা কী বলতে? বলতে, হবে হরিপদ কেরানির মতো একজন। জুতোর শুকতলা ক্ষয়ে যাবে সংসারের ঘানি ঘোরাতে ঘোরাতে। এখন মনে হচ্ছে না, হরিপদ কেরানি হলেই ভালো হত, ছেলেটা কাছে থাকত? তোমরা বাবা মায়েরা ছোটবেলা থেকে সন্তানকে ঘিরে মনে মনে উচ্চাকাঙ্ক্ষার বীজ বুনবে, সন্তানের সাফল্যে আত্মীয় পরিজনের সামনে গর্বে বুকের ছাতি ফুলে উঠবে, আবার তোমাদের স্বপ্ন সফল করে আমরা যখন সত্যিই সাহেবদের দেশে মোটা মোটা ডলার কামাতে আসি তখন তোমরাই আমাদের তিরস্কার করো। সবাই বলে, অমুকের ছেলে আমেরিকায় থাকে, দেশে বুড়ো বাপ মায়ের কথা ভাবেও না। ভুল ! ভুল!সন্ধের অস্তগামী লাল সূর্যটা মায়ের কপালের লাল টিপের কথা মনে পড়িয়ে দেয়। কোনো বাড়ির সামনে বসে থাকা নিঃসঙ্গ বৃদ্ধ মানুষটাকে দেখে আমারও নিজের বাবার কথা মনে হয়। আমেরিকার বার্ধক্য জীবন আমাদের দেশের থেকেও করুণ! অস্বীকার করব না, গোপন অপরাধবোধ মনের গভীরে কোথাও তো কাজ করে। এর চেয়ে হরিপদ কেরানি হলেই বোধহয় ভালো হত। কিন্তু নামি কোম্পানির এম ডির ছেলে হরিপদ কেরানি? মা বলত না, “একটা মোটে ছেলে তুই আমাদের। তুই যদি মানুষ না হোস তাহলে লোকের কাছে মুখ দেখাতে পারব না”। মানুষ হওয়া বলতে সোজা কথায় ‘মিডিওকার’ এর থেকে ওপরে উঠে বিশেষ কিছু করা যাতে সবাইকে বোঝানো যায় ‘একেই বলে ছেলে মানুষ করা’। তাই তো বাবা? আমি আর আমার মতো হাজার হাজার সন্তান রোজ এমন উচ্চাকাঙ্ক্ষার যুপকাষ্ঠে বলি চড়ছি। আবার পরে আমরাই ‘বেইমান’ আখ্যা পাচ্ছি। সুবিমল কাকুর ছেলে শুভ, আমার বাল্যবন্ধু – আটলান্টায় থাকে। গেল হপ্তায় শুভর মা মারা গেলেন। বেচারা একটা প্রজেক্টের শেষ পর্যায়ে এসে আটকে আছে এক মাস ধরে। নাওয়া খাওয়া ভুলে গেছে। ভারতীয় মুদ্রায় পাঁচশো কোটি টাকার প্রজেক্ট। শুভ ফোনে হাউ হাউ করে কাঁদছিল মা মারা যাবার পরে যেতে পারল না বলে। ওর যেতে যেতে শ্রাদ্ধের সময় হয়ে যাবে। ওর বস তাও ওকে দিন পাঁচেকের মধ্যে ছেড়ে দেবে বলেছে। শুভর কষ্ট তোমরা যারা দেশে আছ তারা বুঝবে না। তোমাদের চোখে সে আরেক বিদেশবাসী অকৃতজ্ঞ সন্তান। কিন্তু আমরা জানি শুভর মতো বিদেশি কোম্পানির চাকররা কতটা হাত পা বাঁধা। আজ আমরা না ঘরকা না ঘাটকা।
না বাবা, আমাদের জীবনে তোমাদের অবদান আমরা ভুলিনি। কিন্তু তোমরা ভুলে যাও যে আজ আমরা যেখানে পৌঁছেছি সেটাও তোমাদেরই অবদান। তোমরা হরিপদ কেরানির বাপ মা নও, সুপ্রতিষ্ঠিত বিদেশবাসী সন্তানের বাপ মা। তার কিছু তো মূল্য তোমাদের আর আমাদের – দুপক্ষকেই দিতে হবে। তাই না?
ক্ষমা কোরো। অনেকদিন ধরেই এই একতরফা দোষারোপের কাহিনী শুনে আসছি। তাই আজ মনে হল মুদ্রার অন্য পিঠটাও দেখানো দরকার। ভালো থেকো। সুস্থ থেকো। প্রণাম নিও।
ইতি -তোমাদের বাবাই
রাকেশ ঘোষাল
Comments
Post a Comment