অভিযোগ
এখনকার ছেলেমেয়েদের মুখে অনেক শুনেছি,
বড়ো বাড়ির মেয়ে বা সুন্দরী মেয়ে মানে অহংকারী,
বড়ো বাড়ির ছেলের প্রপোজ একসেপ্ট না করে গরীব বাড়ির ছেলের সাথে বিয়ে করা মানে বড়ো আফসোস,
স্কুলের স্যাররা স্বার্থপর ফার্স্ট বেঞ্চের ছেলেদের বেশি নাম্বার দেয়।
এগুলো কি সত্যিই?
ইউটিউব বা ফেসবুকে প্রায়ই একধরনের স্টোরি ভিডিও দেখতে পাই,যেখানে দেখানো হয় একজন গরীব বাড়ির ছেলে একটা মেয়েকে ভালোবাসে তবে মেয়েটা তাকে পাত্তা দেয় না, কিন্তু বছর কয়েক পরে গরীব ছেলেটা যে অফিসের মালিক মেয়েটার স্বামী সেই অফিসের কর্মচারি।
বিষয়টা এমনভাবে উপস্থাপন করে যেন মেয়েটা বাকি জীবন এটা নিয়ে আফসোস করবে যে কেন ওই ছেলেটাকে বিয়ে করল না।
কী তাইতো?
সত্যিই কী বাস্তবে এমন হয়?
হয় হয়তো কিন্তু আমি এক দিদিভাইকে চিনি যার বিয়ের আগে পাড়ার এক দাদা তার পেছন পেছন ঘুরত। দিভাই পাত্তা দিতেন না। এক সময় দিদিভাইয়ের বিয়ে হয়ে যায়। বছরখানেক পরে দিদিভাইয়ের পেছনে ঘোরা সেই দাদাটি সরকারি চাকরি পেয়ে যান। দেখতে দেখতে সেই দাদার বাড়ি গাড়ি হয়ে যায়। বলতে গেলে দিদিভাইয়ের হাসবেন্ডের চেয়ে অনেক ভালো অবস্থা। দিদিভাই বাবার বাড়ি আসলে সেই দাদা দামী বাইক নিয়ে দিদিভাইয়ের ঘরের সামনে দিয়ে ঘোরাফেরা করেন। ওই দাদা অনেকের সামনে এমনকি আমার সামনেও বলেছেন, মানুষকে অবহেলা করতে নাই। কার ভাগ্য কখন ঘুরে যায় বলা মুশকিল।দেখছিস তো আমাকে পাত্তা না দিয়ে কতো ভুল করলো।
তারপর একদিন দিদিভাই আমার বাড়িতে এসেছিল কোনো এক প্রয়োজনে সেইদিন দিদিভাইকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, দিদিভাই ওই যে দাদা এতো ভালো চাকরি পেল তোমার হাসবেন্ডের থেকে অনেক বড় ধনী ব্যক্তি হয়ে গেল এ নিয়ে কি আপনার কখনো আফসোস হয়?
দিদিভাই হাসতে হাসতে বলেছিলেন, আফসোস তখনি হবে যখন আমি জীবনে অসুখী হব এবং তাকে নিয়ে ভাবব। তার কথা তো ভুলেও কখনো মনে পড়ে না। আর আমি ভাই বেশ সুখেই আছি। আর তোর জামাইবাবুর মতো ভালো মানুষ হয় না,আমার অনেকটা কেয়ার করে,এর থেকে একজন স্ত্রী কী চায় বল।
তখন বুঝলাম বাস্তব জীবনে এই গল্প মূল্যহীন।
তবে সেই মেয়ে যদি লোভী হয় সেটা অন্য ব্যাপার।
চলো তোমাদের আর একটা ঘটনা বলি, আমার এক বন্ধু এক মেয়েকে খুব পছন্দ করত। কিন্তু মেয়ে যেমন সুন্দরী তেমনি বড় ঘরের মেয়ে। বন্ধু সাধারন সেলসম্যান। একদিন বন্ধু মেয়েকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিল। মেয়ে ফিরিয়ে দিয়েছিল। আমার তখন মনে হয়েছিল মেয়েটা অহংকারি।
মাস কয়েক পরে মেয়েটাকে এক ছেলের বাইকের পেছনে দেখলাম। ছেলে যেমন স্মার্ট তেমনি টাকাওয়ালা। বন্ধু বলল, টাকাই সব। ভালোবাসা বলতে কিছু নাই।
আমি বন্ধুর কথা মেনে নিলাম।
পরে ভেবে দেখলাম, আচ্ছা মেয়েটা যে পরিবেশে বেড়ে উঠেছে। যেসব মানুষের সাথে বড় হয়েছে, সেরকম মানুষের প্রতি আকৃষ্ট হওয়ার মাঝে ভুলটা কোথায়?
ধরলাম, বন্ধুর সাথে প্রেম হল। বিয়ে হলো। তারপর? যে মেয়ে জীবনে বিলাসিতায় বড় হয়েছে সে এই অভাবের সংসারে মানিয়ে নিতো কীভাবে?
তার বোনদের স্বামী ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার। সেখানে সেল্সম্যান স্বামী নিয়ে সে কতটুকু সুখী হতো? মানিয়ে চলতে চলতে তার জীবনের সুখ আনন্দ হারিয়ে যেত।
এখন যদি এক কাজের মেয়ে ওই বন্ধুকে পাগলের মতো ভালোবাসে তাহলে কী বন্ধু সেই মেয়ের ভালোবাসা গ্রহণ করবে?
শতভাগ গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারি বন্ধু নাক সিটকে বলবে, কাজের মেয়ে সাথে প্রেম? অসম্ভব।
যারা নিজেই নিজের চেয়ে নিচু অবস্থানের মানুষদের মেনে নিতে পারে না। তারাই অবস্থানের সাথে ভালোবাসার তুলনা করে।
.
আমার কলেজের এক বন্ধু যেমন মোটা তেমন কালো। ওর সাথে রিকশায় আমি ছাড়া অন্যকেউ বসতে পারত না। কারণ জায়গা হতো না। আমি হ্যাংলা মানুষ বলে কোনরকম জায়গা হয়ে যেত।
তো সেই বন্ধু ক্লাসের এক সুন্দরীর প্রেমে পড়ল। কিন্তু পাত্তা পেল না। বন্ধু মাঝে মাঝেই গল্পের ফাঁকে আফসোস করে বলত, ‘আজ যদি গায়ের রঙটা ফর্সা হতো। ওজনটা ষাটের ঘরে থাকত। মেয়েটা আমাকে ভালোবাসত।’
ভেবে দেখলাম বন্ধুর কথাটা ঠিক। কিন্তু যখন একটু বেশি ভাবলাম। তখন মনে হলো ক্লাসে এত মেয়ে থাকতে বন্ধু ওই সুন্দরীর প্রেমেই পড়ল কেন? কেন গ্রামের চুলে তেল দিয়ে আসা মেয়েটার প্রেমে পড়ল না? কেন ওই কালো হ্যাংলা মেয়েটার প্রেমে পড়ল না?
চোখের ভালো লাগার ব্যাপারটা যদি তার ক্ষেত্রে মেনে নেয়া যায় তাহলে ওই সুন্দরীর বেলায় চোখে ভালো লাগার ব্যাপারটা কেন ভেবে দেখব না?
.
সবসময় যে এমনটা হয় তাও না। এর ব্যাতিক্রমও ঘটে। বাজারের যে দোকানটায় বসে আড্ডা দেই সেই দোকানের ভাইয়ের একটু সমস্যা আছে। অনেকটা প্রতিবন্ধি টাইপ। কিন্তু তার প্রেমিকাকে দেখে আমাদের সবার মুখ হা হয়ে গিয়েছিল। এত সুন্দর একটা মেয়ে আর এর সাথে?
পরে বিষয়টা ভেবে দেখলাম মেয়েটা মানুষটার মনের প্রেমে পড়েছিল। ভাই ছিলেন সহজ সরল। খুব সুন্দর গুছিয়ে কথা বলতেন। তার সাথে গল্প করতে বসলে চুপচাপ তার কথা শুনতাম। খুব সাধারণ একটা বিষয়কে তিনি অসাধারণভাবে উপস্থাপন করতেন।
.
আমি যখন ক্লাস নাইনে পড়তাম তখন কার ঘটনা,
স্কুলের প্রায় শিক্ষকই আমায় খুব ভালোবাসতো আর সাহায্য করতো কারন আমি ক্লাসে প্রতিবার প্রথম হতাম, এটা দেখেই কিছু ক্লাস বন্ধুর খুব হিংসে হতো,ওরা আমার সাথে কথা বলতে চাই তো না, খেলতো না,প্রায় একাই থাকতাম। একদিন ক্লাসে কিছু বন্ধু স্যারকে শুনিয়ে শুনিয়ে বলছিল স্যারগুলো সব স্বার্থপর,যে ফাস্ট হয় তাকেই সাহায্য করে।এটা শুনে স্যার বলেছিলেন আচ্ছা তোরা একটা কথা বল তোরা হাত খরচ কার কাছে চাস যে দেয় না? ঠিক তেমনি যে গরীব হয়েও তার পড়া সব সঠিক ভাবে দেয় তাকেই তো ভালোবাসবো , তাকেই তো সাহায্য করবো। তারপর থেকে ওরা আমার সাথে বন্ধুত্ব করলো, কিছু না পারলে আমাকে বলতো ভাই এটা পারবি একটু বলে দে।ওরাই নিজেরাই বলল শিক্ষক খারাপ হয় না আমরাই শিক্ষকের আশা পূরন করিনা।
আসলে অনেকের মুখেই ভালোবাসা নিয়ে নানা রকম অভিযোগ শুনি। কিন্তু কেউ অপর মানুষটার জায়গায় নিজেকে রেখে ভাবতে চায় না। ওই মানুষটা কেন তাকে ভালোবাসবে? বা কেন ভালোবাসে না। যদি ওই মানুষটার জায়গায় নিজেকে রেখে কিছুক্ষণ ভাবে হয়তো সে আর অভিযোগ করবে না।।
রাকেশ ঘোষাল
Comments
Post a Comment