উপলব্ধি



বেশ কিছুদিন ধরেই ভোরে হাঁটতে যাওয়ার সময় রাস্তার ধারে দেখছি এই ছাউনিটি। আজও দেখলাম, কিছুটা হেঁটে সামনে এগিয়ে যাওয়ার পর মনে ভিড় করতে লাগলো কিছু কথা।

বেশ কয়েক দিন হয়েছে খেজুর গুড় বা লবাত বানানোর জন্য এই অস্থায়ী ছাউনিটি। বেশিরভাগটাই প্রাকৃতিক সম্পদ দিয়ে তৈরি। ডাল ,পালা ,বাঁশ দিয়ে কোনরকম মাথাগোঁজার ঠাঁইটি বানিয়েছে কারিগর পরিবারটি। একদম ঠিক সেই চড়াই পাখির মুখে বলা "নিজে হাতে বোনা মোর কাঁচা ঘর খাসা"। সামনে জড়ো করে রাখা হয়েছে শুকনো খেজুর পাতার সারি, সবই খেজুর গুড় বা লবাত বানানোর জন্য জ্বালানির কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হবে।

রুক্ষ যে জমি কয়েকদিন আগে পর্যন্ত ছিল সেই জমি আজ শিল্পীর দক্ষ হাতের ছোঁয়ায় বাসযোগ্য স্থানে পরিণত হয়েছে। চার পাশের ঘাস বা আগাছা এবং অবাঞ্ছিত উদ্ভিদের ডালপালা কেটে পরিষ্কার করে, গোবরজল দিয়ে পলিয়ে সুন্দর করে দেওয়া হয়েছে।

ছোট্ট একটা প্রান্তিক শিল্পী পরিবার বাবা মা এবং দুই সন্তানদের,  দুই তিন মাসের জন্য অস্থায়ী ঠিকানা বানিয়েছে। ত কি সুন্দর লাগছে দেখতে!

 ভাবতে অবাক লাগে সারা পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার শতকরা অর্ধেকেরও অনেক বেশি মানুষই কত অল্পতেই নিজেদের খুশি করে রাখতে পারে। কতটা আনন্দ আছে এদের সারাটা বুক জুড়ে। না আছে মোটা মাইনের চাকরির চিন্তা বা নামকরা শিল্পপতিদের মত কোটি কোটি টাকা করার হাজারটা চিন্তা, না আছে প্রতিবেশীকে বা আত্মীয় স্বজনদের দেখিয়ে দেওয়ার জন্য সম্পদের প্রদর্শন। একচিলতে মাথাগোঁজার ঠাঁই, লজ্জা ঢাকার জন্য সামান্য মানের বস্ত্র আর পেট ভরে খাবার পেলেই এইসব মানুষগুলো কতটা খুশিতে থাকতে পারে তার যেন জলজ্যান্ত উদাহরণ এই পরিবারটি এবং এদের মতো সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে থাকা কোটি কোটি সেইসব মানুষগুলো। 
 
আর আমরা? ছুটে বেড়াচ্ছি,দিনের বা রাতের শান্তির ঘুম নষ্ট করছি, একরাশ হতাশা মনের মধ্যে গ্রাস করছে,  সম্পদ ,গাড়ি-বাড়ি ধন-দৌলত করার নেশায়, সবই আমাদের করতে হবে,সবাইকে দেখিয়ে দিতে হবে আমাদের। আমাদের চাওয়া পাওয়ার এই যে বাসনা তা আজ এতটাই দৈত্যাকার হয়ে উঠেছে এত কিছু পেয়েও যেন আমাদের কাছে কিছু নেই। চিন্তা, হতাশা, মানসিক যন্ত্রণা এসবই আজ যেন বড্ড বেশি পুঁথিগত উচ্চশিক্ষা নেওয়া শিক্ষিতদের রোগে পরিণত হয়েছে ।
 এদের শিক্ষাগত যোগ্যতাকে ছোট না করেই এইসব অশিক্ষিত-অর্ধশিক্ষিত বা শুধুমাত্র নাম লিখতে জানা মানুষগুলো কত অল্পতেই নিজেদের খুশি রাখতে পারে তা আমাদের চোখের সামনে দেখিয়ে দিচ্ছে আমাদের শিক্ষার উপলব্ধি  কতটা হতাশাজনক।কিছুক্ষণ এইসব মানুষদের কাছে কাটালেই বুঝতে পারি কতটা সাংঘাতিক লোভী হয়ে উঠেছি আমরা। সবাইকে একদিন এই নশ্বর শরীরে ধন-সম্পদ ত্যাগ করে যেতে হবে। তবুও এরা আমাদের বারবার শিখিয়ে দেয় মনের শান্তি পেতে গেলে শরীরের সাথে সাথে মনের সরলতাও কতটা প্রয়োজন।

 হয়তো এদের ভিতরেও না ভালো ঘর, ভালো পোশাক, ভালো খাবার, মোটা টাকার মাইনে না পাওয়ার হতাশা, দুঃখ কষ্ট সবই আছে, আমদের সামনে তার প্রকাশ ঘটছে না, কিন্তু তবুও এরা এত কিছু না পেয়েও কতটা স্বাচ্ছন্দে তাদের জীবন কাটিয়ে দিচ্ছে। আর আমরা এদের জীবন দর্শনের কাছে কত সহজে হার মেনে নিচ্ছি,  বা টেক্কা দিতেই পারছি না।কত সহজেই আজকের শিক্ষিত প্রজন্ম থেকে শুরু করে আমদের অনেকেই নিজের অস্তিত্বকে মাটিতে মিশিয়ে দিতে তৎপর হচ্ছি তা সহজেই বুঝতে পারছি।
 
 এক পাশে পড়ে রয়েছে মোটা নাইলন দড়ি, তবে তা হতাশায় গলায় দেওয়ার জন্য নয়, সেই দড়িকে কাজে লাগিয়ে কাঁটাভরা খেজুর গাছে উঠে মিষ্টি খেজুর রস সংগ্রহ করা, এটাই তার ব্যবহার। কি সুন্দর জীবন দর্শন, জীবনের কাঁটা সংকুল পরিস্থিতিকে পাশ কাটিয়ে কিভাবে জীবনে মধুরতা না যায় তাই যেন শিখিয়ে দিচ্ছে এই দড়ি,  কিন্তু সে দেখার চোখটাই আমরা হারিয়ে ফেলেছি। তাই আজ চোখে শুধু আমাদের ধন-সম্পদ, প্রভাব-প্রতিপত্তি, সম্মানের মরীচিকা।
 
 এটাই হয়তো পার্থক্য আমাদের উচ্চাকাঙ্খার জীবনের সঙ্গে এইসব সারল্য ভরা মানুষের । দুঃখ, কষ্ট, না পাওয়ায় হতাশা নিয়েই, ব্যর্থতা নিয়েই জীবন। কিন্তু তার থেকেও অনেক বেশি যেটা শিক্ষা নেওয়া দরকার সেটা হলো লড়াই করার মানসিকতা। আমার সাধারণ মানের জীবিকা বা কাজ দেখে লোকে কী বলবে সেইসব ভাবার পরোয়া করে না এইসব মানুষেরা, তাই সুখ বা শান্তি এদের জীবনে, লোকে কী বলবে তার ভাবার দরকার নেই, আমাকে লড়তে আর এই জীবনের যুদ্ধে, লড়াই করার এই মানসিকতা তাদের জীবনকে সম্পূর্ণতা প্রদান করেছে। এখানেই আমরা এদের থেকে পিছিয়ে পড়ছি, আর আগামী দিনে এই দূরত্বটা যে বাড়তেই থাকবে তা বুঝতে পারছি ।
 

অনেক কথা মাথায় এলে ওই সময়ের মধ্যেই হাঁটতে হাঁটতে। পুবাকাশে ঠিকরে বেরোচ্ছে নতুন দিনের রক্তিম সূর্যের আলো। প্রত্যেকের জীবনে এরকম সূর্যের আলো জীবনের যুদ্ধে লড়াই করার ক্ষমতা নিয়ে আসুক ঈশ্বরের কাছে এই প্রার্থনা করি।

রাকেশ ঘোষাল

Comments

Popular posts from this blog

গ্রীষ্মের_ছুটিতে ছাত্রের লেখা খোলা চিঠি