সোনার হরিণ
একটা কথা বলুন ম্যাডাম, আপনাদের তো লিগ্যালি ডিভোর্সটা হয়নি, তাই না?
একটু ব্যাঙ্গাত্মক স্বরে রিপোর্টার বললেন, ভবিষ্যতে কি নামি চিত্রশিল্পীর সাথে আবার সংসার করার ইচ্ছে আছে আপনার?
ম্লান হেসে অত্যন্ত সাধারণ পোশাকের ব্যক্তিত্বময়ী মহিলাটি বললেন, সংসার?
না বোধহয়। সকলের তো তথাকথিত সংসার গড়ে ওঠে না।
তবে আপনাদের স্বনাম ধন্য চিত্রশিল্পীর আমিও একজন শুভাকাঙ্খী।
সোনালী একটু নিচু স্বরেই কথা বলছিল। সাধারণত ক্যামেরার সামনে কথা বলার তেমন অভ্যাস নেই ওর। তারপর আবার ভেঙে যাওয়া সংসারের জের টেনে আজ এই রিপোর্টাররা ওর ভাড়া বাড়িতে উপস্থিত হয়েছে।
ম্যাডাম এই যে ,শিল্পী শুভদীপ সান্যাল পদ্মশ্রী পুরস্কার পাচ্ছেন,তার 'একলা থাকার মুহূর্ত' ছবিটা নিলামে উঠে প্রায় কোটি টাকায় বিক্রি হচ্ছে,স্ত্রী হিসাবে আপনার গর্ব হয়না?
সোনালী ধীরে ধীরে বললো, বন্ধু হিসাবে গর্ব হয় বৈকি।
তার সাফল্য কামনা করি।
তবুও ম্যাডাম, আপনারা তো বছর দুয়েক একসঙ্গে সংসার করেছিলেন, তো সেই অভিজ্ঞতা থেকেই বলুন , মানুষ হিসাবে শুভদীপ সান্যাল কেমন? স্বামী হিসাবেই বা কেমন ছিলেন?শিল্পী হিসেবে যে উনি দারুন সাকসেসফুল সেটা তো ওনার পুরস্কারই বলে দিচ্ছে।
স্বামী হিসাবেও তিনি যথেষ্ট ভালো মানুষ ছিলেন।
তাহলে ম্যাডাম আপনারা সেপারেট থাকেন কেন?
প্রশ্নটা বড় ব্যক্তিগত। এটাই উত্তর না পেলেও শুভদীপ স্যন্যালের পদ্মশ্রী পুরস্কারটা আটকে যাবে না । আপনারা এবার আসুন।
ম্যাডাম, ওনার প্রিয় রং?
রং নিয়েই তো ওর কাজ। রামধনুর সাতটা রংই ওর প্রিয়। তবে আমার জন্য যতগুলো নিজে পছন্দ করে শাড়ি কিনেছে, প্রতিটা সোনার হরিণ রঙের।
ম্যাডাম,ওনার প্রিয় খাবার?
আগে তো কলাইয়ের ডাল আর অলুপোস্ত ছিল। শীতের রাতে তরকা রুটি খেতে পছন্দ করতো।
কোনোমতে মিডিয়ার প্রশ্নের থেকে নিস্তার পেয়ে ঘরের দরজা বন্ধ করলো সোনালী।
ফোনটা তিনদিন আগেই পেয়েছে সোনালী। শুভদীপই ফোন করে জানিয়েছিল,তার পদ্মশ্রী পাওয়ার খবরটা।
সত্যি বলতে কি সেই কলেজ থেকেই সোনালীর স্বপ্ন ছিল, শুভদীপ একদিন এভাবেই প্রতিষ্ঠিত হোক।
আজও তার ব্যতিক্রম নয়।
চোখের সামনে থেকে ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে এতবছরের অম্ল মধুর স্মৃতি। আপাতত দৃষ্টিপথে ভিড় করে এসেছে কলেজের সেকেন্ড ইয়ারে স্মৃতি।
সোনালী সেদিন ইচ্ছে করেই মায়ের একটা সোনার হরিণ রঙের শাড়ি পরে কলেজে গিয়েছিল। পিছন থেকে একটা অপরিচিত কণ্ঠের ডাকে থমকে গিয়েছিল ওর গতিশীল পা দুটো।
এই যে সোনার হরিণ...শুনছেন!
পিছন ফিরতেই একটা ছেলের মুখ। পৃথিবীর সমস্ত ভাবনা যেন তারই মাথায়,এমন ভাব করে এগিয়ে আসছে এই দিকেই।
মনেহচ্ছে ছেলেটি না ভাবলে যেন, পৃথিবী এখুনি পরিবর্তন করবে তার গতিপথ। এমন আঁতেল মার্কা ছেলে সোনালীর কোনো কালেই পছন্দ নয়।
বিশেষজ্ঞ বিশেষজ্ঞ ভাব, এরা মনে করে এরাই সব জান্তা।
ছেলেটি কাঁধের শান্তিনিকেতনি ব্যাগ সামলে এসে পৌঁছেছে সোনালীর সামনে।
ম্যাডাম , আপনার সাথে একটু পার্সোনাল দরকার ছিল।
সাধারণত অপরিচিত ছেলেরা এভাবেই মেয়েদের সাথে আলাপ জমায়। সোনালী স্কুল লাইফ থেকে দেখেছে। নতুন কিছু নয়।
ছেলেটি বললো, আমি শুভদীপ সান্যাল। ফাইনাল ইয়ার ,ইংলিশ...
আমি এই রঙের একটা শাড়ি বহুদিন ধরে খুঁজছিলাম। আমার যেগুলো চোখে পড়েছে সব গুলোই হয় একটু লাইট শেড নয় ডিপ। এই নির্দিষ্ট রংটা পাইনি। প্লিজ ম্যাডাম আপনি যদি শাড়িটা একটু আমাকে ধার দেন?
সর্বাঙ্গ জ্বলে গেল সোনালীর।
পরনের শাড়ি যে কোনো অপরিচিত চাইতে পারে, এটাই যেন বিশ্বাস করতে পারছিল না ও।
কোনোমতে কন্ট্রোল করে বললো, আগে মেয়েদের সাথে ভদ্র ভাবে কথা বলতে শিখুন।
ছেলেটি জিভ কেটে বললো, না না ম্যাডাম..আমি এই মুহূর্তে চাইনি। আমি বললাম, যদি কাল কলেজে আনেন।
বিরক্ত মুখে কোনো উত্তর না দিয়েই পা চালালো সোনালী।
কলেজ ফেস্টএর আনন্দটাই নষ্ট হয়ে যাবে ওই ফালতু ছেলেটির সাথে কথা বলতে লাগলে। বন্ধুরা অপেক্ষা করছে সোনালীর জন্য।
ছেলেটি আরো দুবার ডাকলো,ও ম্যাডাম শুনুন না...
সোনালী জোরে পা চালালো।
নীলাঞ্জনা, রাত্রি,দেবীকারা ঘিরে ধরে বলল, আজ তোকে সত্যি অপরূপা লাগছে সোনালী। এই বয়সে নিজের রূপের প্রশাংসা শুনতে কার না ভালো লাগে।
পথ চলতি মানুষের মুগ্ধ দৃষ্টিতে নিজেকে নতুন করে খুঁজে পেতে ইচ্ছে করে।
তবে মোটেই ওই শুভদীপের মত অসভ্য ছেলের প্রশংসা শোনার ইচ্ছে নেই সোনালীর।
অনুষ্ঠান শুরু হয়ে গেছে।
সোনালীদের জিওগ্রাফির রিক্তা গান গাইছে এখন। রিক্তা ভীষণ মিষ্টি গায়। বেশ কয়েকটা কবিতা,গানের পরেই ওই একটু আগের দেখা আঁতেল ছেলেটা স্টেজে উঠলো।
নিশ্চয় ভুলভাল জ্ঞান ফলাতে, নয়তো দাদাগিরি দেখিয়ে মাইক্রোফোনের সাউন্ড টেস্ট করতে উঠেছে স্টেজে।
বিশাল একটা সাদা ক্যানভাস ঘাড়ে উঠেছে। পাশের টেবিলে রংতুলি।
দর্শকবৃন্দ ভ্যাবলার মত তাকিয়ে আছে। শুভদীপ শেষ পর্যন্ত কি আঁকে সেটাই কৌতুহল। সোনালী রাত্রির কানে কানে বললো, রবি ঠাকুরের মুখ আঁকবে দেখ। ওই একটাই জানে। বেশির ভাগ শিল্পী মঞ্চে উঠেই সাসপেন্স তৈরি করে রবিঠাকুরের মুখ আঁকে,দিয়ে হাততালি কুড়ায়।
হঠাৎ নীলাঞ্জনা বললো, না রে কোনো নারী মূর্তি আঁকছে। ওই দেখ লম্বা চুলের টান...
তাহলে নিঃস্বন্দেহে মোনালিসা।
ক্যানভাস গার্ড হয়ে রয়েছে শুভদীপের শরীরে। হালকা মিউজিক বাজছে মঞ্চের পাশে।
রঙের শেষ আঁচড়টা দিয়েই ক্যানভাসের সামনে থেকে সরে পাশে দাঁড়ালো শুভদীপ।
অসহ্য রাগে আগুন ছুটছে সোনালীর দুটো চোখে। কলেজের সকলের দৃষ্টি এখন চেয়ারে বসে থাকা সোনালীর দিকে। কারণ শুভদীপের ক্যানভাসেও তখন সোনার হরিণ রঙের শাড়ি পরা হুবহু সোনালী।
শুভদীপ মাইক্রোফোন টেনে নিয়ে বললো, আমার রং আজ ওনাকে আঁকতে চাইছিল, আমি নিরুপায়। তুলির কথা না শুনে কোনো উপায় থাকে না শিল্পীদের।
হাততালির সাথে সাথে হাসির রোল।
চেয়ার ছেড়ে উঠে চলে এসেছে সোনালী। ইস! গোটা কলেজ ভাবছে ওই ছেলেটার সাথে নিশ্চয় সোনালীর কোনো সম্পর্ক আছে।
বাড়ি ফেরার কিছুক্ষন পরেই রাত্রির ফোন।
এই সোনালী রাগ করিস না ,শুভদীপ দা তোর বাড়ির এড্রেসটা জানতে চাইলো। আমি দিয়ে দিলাম।
এরা বন্ধু না শত্রু? খট করে ফোনটা কেটে দিলো সোনালী।
মা কাউকে যেন বলছে, এস বাবা ভিতরে এসো।
সোনালী উঁকি মেরে দেখলো, মূর্তিমান বিভীষিকা দাঁড়িয়ে আছে।
মা বলছে, ওহ সোনালী তোমার বান্ধবী? তা বসো ঘরে।
মা আদর করে ঘরে বসিয়েই ডাকলো সোনালীকে।
অগত্যা! ড্রয়িংয়ে শুভদীপের সম্মুখীন হতেই হলো।
ঘাড়ে করে নিজের আঁকা সোনালীর ছবিটাও আবার এনেছে।
শুভদীপ মিষ্টি করে হেসে বললো, এটা তোমার জন্য।
প্লিজ...
মায়ের সামনে অভদ্রতা না করতে পেরে ছবিটা ওর হাত থেকে নিয়ে বিদেয় করলো শুভদীপকে।
নিজের ঘরে এসে ছবিটার দিকে বেশ ভালো করে তাকিয়ে দেখল, ছেলেটা অভদ্র হলেও,দুর্দান্ত আঁকে।
ছবির কোনে একটা ছোট্ট চিরকুট।
চিরকুটটা খুলতেই ,
ম্যাডাম, দেখো তো তোমার ঠোঁটের ভিজে ভিজে ভাবটা আমি ছবিতে ফোটাতে পেরেছি কিনা।
আর তোমার চোখের রাগ...
তোমার গালের লালিমা..
পেরেছি নিখুঁত করতে?
না না, সোনালী আমার তুলি হেরে গেছে। তুমি আরও বেশিই সুন্দর।
সোনার হরিণের মতোই। অপ্রাপ্য।
এই প্রথম কোনো চিরকুট পড়ে সোনালী লজ্জা পেল।
পরেরদিন কলেজ যাবার সময় কি মনে হতে মায়ের সোনার হরিণ রঙের শাড়িটা ব্যাগে ভরে নিলো।
ধুর, কি যে হলো সোনালীর! বারবার ইংরেজি ডিপার্টমেন্টের দিকে চোখ চলে যাচ্ছে।
না! সে মনেহয় আজ আসেনি।
যাক বাঁচা গেছে! তিনটে পিরিয়ড পর কলেজ ক্যান্টিনের দিকে পা বাড়াতেই পিছন থেকে ডাক।
খুঁজছিলে তো আমাকে?
দাও...
কি অভদ্র ছেলেরে বাবা!
বিরক্ত হয়ে সোনালী বলেছিল, আমি অকারণে তোমাকে খুঁজতে যাবো কেন?
শুভদীপ এক গাল হেসে বললো, আরে শাড়িটা আর কতক্ষন ব্যাগে বয়ে নিয়ে বেড়াবে? ওটা দেবার জন্যই খুঁজছিলে!
এই ছেলে কি করে জানলো,আজ ওই শাড়িটা ব্যাগে করে এনেছে সোনালী!!
বেশি কথা না বলে, সোনালী বললো..মায়ের নতুন শাড়ি...রঙ লাগলে মা বকবে কিন্তু।
শুভদীপ নিশ্চিন্ত মুখে বললো, আরে আমি তো শুধু শাড়ীটাকে পাশে ফেলে একবারে এই রংটা তৈরি করব। দেখলে না, তোমার ছবির শাড়িটা লাইট সোনার হরিণ হয়েছে। এই রংটা আনতে আরো কিছু মেশাতে হবে। আনমনে শাড়িটা নিয়ে হাঁটা জুড়লো শুভদীপ। একটা থ্যাংকসও জানালো না সোনালীকে।
দিন তিনেক আর কোনো পাত্তা নেই শুভদীপের। সোনালী নিজের অবয়ব বারংবার দেখেছে ওর আঁকা ছবিতে।
দিন তিনেক পরে কলেজে ঢুকেই শুভদীপ বললো, আরও কয়েকদিন লাগবে,তারপর ফেরত পাবে শাড়িটা।
তারপরই খামখেয়ালি ছেলেটা বললো, সোনালী তুমি লাভ এট ফার্স্ট সাইটে বিশ্বাসী?
না, সোনালী দুদিন আগেও ওই হঠাৎ দেখা প্রেমে বিশ্বাসী ছিল না। কিন্তু কয়েকদিন ধরেই অবাধ্য মনের লাগাম বিহীন প্রশ্রয়ে বেশ ভালো মত বুঝতে পারছে , ওর মধ্যে একটা পরিবর্তন হচ্ছে।
কেন বলতো?প্রশ্নটা ইচ্ছে করেই ছুঁড়ে দিয়েছিল সোনালী।
শুভদীপ বললো, না ...আমিও বিশ্বাস করতাম না,ওই এক পলকের প্রেমে। তবে তোমাকে দেখার পর থেকে মনে হচ্ছে, ইংরেজি সাহিত্য নেহাত ভুল বলেনি।
একঝাঁক কৃষ্ণচূড়ার আবির এসে মূহুর্তে রাঙিয়ে দিয়েছিল সোনালীর গালদুটো। সেটা দেখেই হয়তো শুভদীপ বলেছিল, আমি কেন কবি হলাম না। তবে এই মুহূর্তের মুখটা আমি নিশ্চয় আঁকবো আমার তুলির আঁচড়ে।
তারপরের দিনগুলোর আর হিসেব থাকেনি।
তবে মাস্টার্স করতে করতেই পড়া ছেড়ে দিয়েছিল শুভদীপ। কিছুতেই কথা শোনেনি সোনালীর।
শুভদীপের বাবা মাও ছেলের এই পাগলামিকে মেনে নেন নি। মনোমালিন্যের জেরে বাড়ি ছেড়ে একটা মেসে এসেg উঠেছিল ও।
সোনালী আপ্রাণ চেষ্টা করছিল, শুভদীপকে সাহায্য করার। নিজের সোনার হার ,কানের দুল বেচে শুভদীপের জন্য আঁকার সরঞ্জাম কিনেছিল। বাড়িতে বলেছিল, হার ,কানের দুল চুরি হয়ে গেছে।
মায়ের কাছ থেকে বেশি করে টিফিন নিয়ে এসে ওকে খাইয়েছে একসময়।
তারপরই সোনালী স্কুলের চাকরিটা পেয়ে যায়।
বাড়ির সকলের অমতে, আত্মীয় স্বজনদের ব্যাঙ্গকে গায়ে না মেখেই রেজিস্ট্রি করে নেয় ওরা।
সকলে ছি ছি করেছিল, শেষ পর্যন্ত একটা বেকার ছেলেকে বিয়ে করলো সোনালী?
বাবা,মা অভিমানে কথা বন্ধ করে দিয়েছিল সোনালীর সাথে।
সোনালীর তখন একটাই চিন্তা ছিল, কি করে শুভদীপকে সমাজে প্রতিষ্ঠা পাওয়াবে।
সোনালীর স্কুলের চাকরীর টাকায় ওদের সংসার চলছিল। ছোট্ট ভাড়ার ফ্ল্যাটে শূন্য থেকে শুরু হয়েছিল ওদের পুতুল পুতুল সংসার।
সেখানেও সমস্যা। একটা অপরাধবোধে যেন ভুগছিল শুভদীপ। বারবার বলতো, বেকার স্বামীকে খাইয়ে দাইয়ে শিল্পী করতে চাইছো সোনালী?
যদি ব্যর্থ হই। তবুও সোনালী ভরসা করতো শুভদীপের তুলিকে।
শুভদীপ তখন পাগলের মত ছবি এঁকে চলেছে। হঠাতই শুভদীপ একটা ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে আঁকার শিক্ষক হিসেবে চাকরি পেলো ও। সোনালী বারণ করেছিল,চাকরিটা করতে । শোনেনি শুভদীপ। দিনরাত লোকের কাছে বউএর পয়সায় খাচ্ছিস শুনতে শুনতে বিরক্ত হয়ে গিয়েছিলো ও।
প্রথম মাসের মাইনের টাকায় সোনালীর জন্য একটা সোনার হরিণ রঙের পিওরসিল্ক কিনেছিল শুভদীপ। বিয়ের পর স্বামীর কাছ থেকে পাওয়া ওর প্রথম উপহার। বড্ড যত্নে রেখেছিল সোনালী শাড়ি টাকে।
শুভদীপের মত খামখেয়ালি ছেলে কোনোদিনই দশটা পাঁচটা চাকরি করতে পারবে না ,সেটা জানতো সোনালী।
মাস তিনেক পরেই কর্তৃপক্ষের সাথে মনোমালিন্য হয়ে চাকরিটা ছেড়ে দিলো শুভদীপ।
ঠিক সেই সময়েই প্রেগন্যান্ট হয়েছিল সোনালী।
সমস্যার সূত্রপাত ওখান থেকেই। শুভদীপের একটুও ইচ্ছে ছিল না, এই মুহূর্তে ,এই ভাড়ার ফ্ল্যাটে ওদের সন্তান হোক। তাছাড়া শুভদীপ বলেছিল, কি চাও তুমি সোনালী?
আমার সন্তানের সামনেও আমাকে অপদার্থ প্রমান করতে চাও। বেকার বাবা..!
ওর দুচোখে ছিল একরাশ ঘৃণা, অজানা আক্রোশ।
সোনালীকে বাধ্য করেছিল, বাচ্চাটাকে নষ্ট করতে ।
সেদিন থেকেই সোনালীর জীবনটা হয়ে উঠেছিল, বেরঙিন।
বাড়িময় শুভদীপের অনেক রং ছড়ানো থাকলেও সোনালীর চোখে সব ধূসর ঠেকত।
দূরত্ব বাড়ছিল দুজনের মধ্যে।
শুভদীপের ব্যবহার বদলাচ্ছিলো আস্তে আস্তে।
সোনালীকে কথার বানে আক্রমন করেই যেন ওর আনন্দ।
তারপরই শুভদীপের জীবনে একটা এক্সিবিশন করার সুযোগ এসে যায়। না, আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি শুভদীপকে। কিন্তু সোনালীর কাছ থেকে ক্রমাগত সরে গেছে ও। ওর আঁকার প্রশংসা করলে ও বলতো, দেখো সোনালী...একদিন আমার ছবি লাখে খেলবে। তোমার সারামাসের রোজগারের পঁচিশ হাজারের গরম সেদিন কি ভাবে দেখাবে?
গলার কাছে কান্নাগুলো জমাট বাঁধত। তবুও সোনালী চাইতো শুভদীপ বড় হোক। ওর মধ্যে যে শিল্পীসত্তা আছে তার বিকাশ ঘটুক।
ব্যর্থ শিল্পীর কষ্টটা খুব কাছ থেকে অনুভব করত সোনালী। তাই শুভদীপের ওই অপমানগুলোকে মেনে নিত দিনের পরদিন।
সেদিন রাতে শুভদীপ আঁকছিলো ওর এক্সিবিশনের আঁকা। রাত তখন প্রায় দেড়টা। হঠাৎই অসহ্য পেটে যন্ত্রনা শুরু হলো সোনালীর। যন্ত্রনায় নীল হয়ে যাচ্ছিল সোনালীর ফর্সা মুখ।
চিৎকার করে ডেকেছিল শুভদীপকে। শুভদীপ ঘরে ঢুকে বলেছিল, ঘুমানোর চেষ্টা করো, আমাকে কালকের মধ্যেই আঁকাটা জমা দিতে হবে। সারারাত কাজ করতে হবে। প্লিজ আজ অন্তত পেটে যন্ত্রনা বলে আমার কাজটাকে পন্ড করো না।
বিয়ের পর থেকে কখনো শুভদীপের কাছে কোনো সাহায্য চায়নি সোনালী। নিজেই এম্বুলেন্সে ফোন করেছিল। শুভদীপকে আর একটুও ডিস্টার্ব না করেই পৌঁছেছিল ওর বাবার পরিচিত একটি নার্সিংহোমে।
সোনালীর বাবা মাও এসেছিল সেই রাতে।
না, শুভদীপ আসেনি। জীবনের শ্রেষ্ঠ আঁকা ছেড়ে সে আসতে পারেনি।
অপেন্ডিক্স অপারেশনের পর একদিনের জন্যই এসেছিল সোনালী নিজেদের ফ্ল্যাটে । নিজের টুকিটাকি জিনিস গুছিয়ে নিতে।
আটকায় নি শুভদীপ। শুধু বলেছিল, সোনালী ..তুমি ভুল বুঝলে আমাকে।
সোনালী বলেছিল, বড় শিল্পী হও। ইংরেজি সাহিত্যে ভুল বলেছিল, প্রথম দেখায় প্রেম হয়না। একটা আকর্ষণ তৈরি হয়।
তারপর কেটে গেছে তিন বছর।দুজনেই দুজনের জন্মদিনে উইস করেছে। শুভদীপের একটার পর একটা সাফল্যে অভিনন্দন জানিয়েছে সোনালী। তবে সবটাই দূর থেকে। বাপের বাড়িতে ফেরেনি সোনালী।
একটা ফ্ল্যাট ভাড়া করে থেকে গেছে।
ওর একলা জীবন, শুভদীপের স্মৃতিতে ভরা। সোনার হরিণ রঙের শাড়ি পরেছে, শুধু কেউ আর ম্যাডাম..বলে ডেকে ওঠেনি। রাতের বিছানায় কেউ আর দুস্টুমি করে বলেনি, এই সোনালী তুমি আমার মডেল হবে?
শুভদীপের শরীর খারাপ শুনে প্রতিবারই ছুটে গেছে সোনালী। শুভদীপও ওর প্রতিটা সাকসেসের পর একটা করে সুন্দর উপহার পাঠিয়েছে ওকে,তবুও ওদের সম্পর্কের শীতলতা তেমনি বরফ ঠান্ডা হয়েই রয়ে গেছে।
রিপোর্টাররা চলে গেছে বেশ কিছুক্ষন।
শুভদীপ ফোন করেছে।
চোখের জলটা মুছে খুব স্বাভাবিক গলায় সোনালী বললো,বলো...
ওপ্রান্ত তখনো নিশ্চুপ।
কাল আমার ছবিটা প্রাইজ পাচ্ছে। তুমি কি আমার সঙ্গে যাবে?
সোনালী দৃঢ় গলায় বলল, সেই কলেজ থেকে আমি আজকের দিনটার স্বপ্ন দেখতাম শুভদীপ। আমি আজ খুব খুশি। কিন্তু তোমার এই কৃতিত্বের ভাগীদার তো আমি নই। আমি নাহয় দূর থেকেই দেখবো তোমার সাফল্য।
শুভদীপ একটু জোরে নিশ্বাস নিয়ে বললো, আমার নিলামে ওঠা ছবিটা তুমি দেখেছো সোনালী? টিভিতে সেদিন দেখালো।
না, শুভদীপ..আমার দেখা হয়নি। তবে নিশ্চয় দেখবো। ফোনটা কেটে গেছে।
শুভদীপের চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে করছে, ক্ষমা করো সোনালী। তোমার অপদার্থ প্রেমিককে,অপদার্থ স্বামীকে,তুমি ক্ষমা করো। নিজের অপদার্থটা ঢাকতে অকারণে ক্ষত বিক্ষত করেছি তোমাকে। একবার কি ক্ষমা করা যায় না সোনালী?
কিছুই বলতে পারল না শুভদীপ।
মঞ্চে একটা বিশাল পর্দার আড়ালে রয়েছে শুভদীপের আঁকা ছবিটা। যেটা নিলামে কোটি টাকা দাম উঠেছে।
দর্শকের আসনে অনেকটা দূরে নিজেকে লুকিয়ে বসে আছে সোনালী।
শুভদীপ সান্যালের সাফল্য দেখার লোভটা কিছুতেই সম্বরন করতে পারেনি ও।
শুভদীপ দাঁড়িয়ে আছে স্টেজে।
ইস, আজ অন্তত একটু ভালো পোশাক পরে আসতে হয়। সেই কবেকার একটা সোনালীর কিনে দেওয়া পাঞ্জাবি পরেই মঞ্চে উঠেছে পদ্মশ্রী পুরস্কার প্রাপ্ত চিত্র শিল্পী।
ছবির ঢাকা উন্মোচন করলো শুভদীপ। বুকটা মোচড় দিয়ে উঠলো সোনালীর।
ছি ছি এ কি এঁকেছে শুভদীপ! এ দৃশ্য কোনোদিন দেখতে চায়নি সোনালী। কোনোদিন না...
সোনার হরিণ রঙের একটা আঁচল উড়ছে.. যেটা ক্রমশ সাদা হয়ে যাচ্ছে....সাদা আঁচলের নীচে একটি জীবন্ত লাশ। যার মুখটা শুভদীপের মত। শুভদীপের গলার কাছের লালচে তিলটা পরিষ্কার ছবিতে। সোনালীর খুব পছন্দের ওই লালচে তিলটা। কত রাতে সোনালীর ঠোঁট স্পর্শ করেছে ওই তিলটাকে।
অঝোরে কেঁদে ফেলেছে সোনালী।
ধীরে ধীরে উঠে মঞ্চের কাছে গিয়ে দাঁড়িয়েছে ও।
শুভদীপ ওকে দেখেই হাত বাড়ালো।
কানের কাছে এসে বললো, 'জানতাম আসবে। '
কিছু কিছু সম্পর্কের সত্যিই কোনো সংজ্ঞা হয়না,এরা বয়ে চলে নিজেদের গতিতে।
দূরে থাকলেও কোনো কোনো ভালোবাসার রং ধূসর হয়না। একমাত্র ভালোবাসাতেই বোধহয় সব অপরাধের ক্ষমা হয়।1
রাকেশ ঘোষাল
Comments
Post a Comment